আজ, শুক্রবার | ২৪শে জুলাই, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | রাত ১১:০৮

ব্রেকিং নিউজ :
কালের সাক্ষী লাকার্তা সিকদার বাড়ি: শরীয়তপুরের এক অনন্য ঐতিহাসিক উপাখ্যান পদত্যাগ করলেন রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন শালিখায় বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে যুবকের মৃত্যু মহম্মদপুরে পুকুরে ডুবে চাচাতো দুই বোনের মৃত্যু মাগুরায় স্কুল ছাত্রী ধর্ষণে ব্যর্থ হয়ে হত্যা মামলায় এক যুবকের মৃত্যুদণ্ড শেখ হাসিনার দেশে ফিরে আদালতে উপস্থিত হওয়া একমাত্র আইনি পথ চাঁদপুরে ট্রান্সফরমার খোলার সময় বিদ্যুৎস্পৃষ্টে প্রাণ গেল ব্যক্তির মাগুরায় অনলাইন জুয়া চক্রের মাস্টার এজেন্টসহ দুই জন গ্রেফতার জাতীয় পর্যায়ে  মাগুরার হুমাইরা সারাদেশে প্রথম শরীয়তপুরের বুকে এক টুকরো ইতিহাস: ছায়াঘেরা ‘ছয়গাঁও সিকদার বাড়ি’র খোঁজে

কালের সাক্ষী লাকার্তা সিকদার বাড়ি: শরীয়তপুরের এক অনন্য ঐতিহাসিক উপাখ্যান

সঞ্জয় কুমার দত্ত : ​মেঘনা ও কীর্তিনাশা বিধৌত পলিমাটির জেলা শরীয়তপুর। নদীভাঙন আর প্রকৃতির খেয়ালের সাথে লড়াই করে টিকে থাকা এই অঞ্চলের বুকে লুকিয়ে আছে শত বছরের বহু ইতিহাস আর ঐতিহ্য। তেমনই এক জীবন্ত ইতিহাসের মুখোমুখি হতে আমরা যাত্রা করেছিলাম শরীয়তপুর জেলার ভেদরগঞ্জ উপজেলার ছয়গাঁও ইউনিয়নের এক নিভৃত গ্রাম লাকার্তায়। উদ্দেশ্য, মোঘল ও ব্রিটিশ আমলের এক অবিস্মরণীয় কীর্তি এবং এ অঞ্চলের আভিজাত্যের প্রতীক ‘লাকার্তা সিকদার বাড়ি’র অন্তরালে লুকিয়ে থাকা গল্পগুলোকে ছুঁয়ে দেখা।

শরীয়তপুর জেলা শহর থেকে পিচঢালা পথ ধরে গ্রামীণ স্নিগ্ধতার মধ্য দিয়ে যখন আমাদের গাড়ি লাকার্তা গ্রামে পৌঁছালো, তখন দুপুরের সোনাঝরা রোদ গাছের পাতা ভেদ করে মাটিতে আল্পনা আঁকছিল। শান্ত, ছায়ানিবিড় এই গ্রামের পরতে পরতে যেন জড়িয়ে আছে শতাব্দীর প্রাচীন আভিজাত্যের সুবাস। এই গ্রামেই কালের প্রবল স্রোত উপেক্ষা করে সগৌরবে দাঁড়িয়ে আছে খান বাহাদুর খলিলুর রহমান সিকদারের স্মৃতিবিজড়িত ঐতিহাসিক জমিদার বাড়ি।

​ইতিহাসের পাতা থেকে: ঐতিহ্যবাহী সিকদার বংশ
​লাকার্তা সিকদার বাড়ির মূল গোড়াপত্তন ও ঐতিহ্যের ইতিহাস অনেক প্রাচীন। প্রাপ্ত তথ্য ও তোরণের শিলালিপি অনুযায়ী, ১৬৮৭ খ্রিষ্টাব্দে তথা মোঘল আমলের শেষভাগে এই বংশের আনুষ্ঠানিক সমৃদ্ধি ও ভিত্তিস্থাপন ঘটেছিল। পরবর্তীতে ব্রিটিশ আমলে এই বংশের অন্যতম বিশিষ্ট মুসলিম ব্যক্তিত্ব খান বাহাদুর খলিলুর রহমান সিকদারের হাত ধরে এর জৌলুস আরও বৃদ্ধি পায়। উনিশ শতকে এ অঞ্চলে তাঁর প্রভাব-প্রতিপত্তি ছিল কিংবদন্তিতুল্য। তিনি কেবল একজন প্রজাহিতৈষী জমিদারই ছিলেন না, বরং ব্রিটিশ সরকারের কাছ থেকে ‘খান বাহাদুর’ উপাধিতে ভূষিত হওয়া এক অনন্য ব্যক্তিত্ব ছিলেন। শিক্ষা বিস্তার, জনকল্যাণ এবং ধর্মীয় অনুভূতির প্রসারে তাঁর ও তাঁর পূর্বসূরিদের অবদান এ অঞ্চলের মানুষ আজও শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করে।

প্রবেশদ্বারের মহিমা: আভিজাত্যের প্রথম পাঠ
​সিকদার বাড়িতে প্রবেশের সময় আমাদের স্বাগত জানাল দুটি ভিন্ন ও চমৎকার তোরণ বা গেট। প্রধান মাজার রোডের সাথে সংযোগ স্থাপনকারী তোরণটি যেমন ইতিহাসের বার্তা দেয়, তেমনই ভেতরের দিকে থাকা আরেকটি শ্বেতপাথরের আধুনিক তোরণ দর্শনার্থীদের চোখ জুড়িয়ে দেয়। শ্বেতপাথরের তোরণটির গায়ে লতাপাতার সূক্ষ্ম কারুকাজ এবং চমৎকার ক্যালিগ্রাফিতে খোদাই করে লেখা রয়েছে—”আল্লাহু আকবার, সিকদার বাড়ী, লাকার্তা, স্থাপিত – ১৬৮৭ ইং”। এই তোরণটি পার হতেই মনে হলো যেন আমরা বর্তমান সময় থেকে বহু শতাব্দী প্রাচীন কোনো রাজকীয় অতীতে পদার্পণ করলাম।

​ধ্বংসাবশেষে অতীতের ছায়া
​তোরণ পেরিয়ে ভেতরে প্রবেশ করতেই চোখে পড়ে মূল জমিদার ভবনের অবশিষ্টাংশ। সময় ও প্রকৃতির নির্মম আঘাতে প্রাসাদের অনেক অংশই আজ জরাজীর্ণ। লাল ইটের তৈরি প্রাচীন একতলা ভবনটির দিকে তাকালে বুকটা কেমন যেন হু হু করে ওঠে। ভবনটির তিনটি খিলান আকৃতির লাল রঙের দরজা আর জানালা এখন শ্যাওলা আর লতাগুল্মের দখলে।

​কিছুটা এগোতেই চোখে পড়ে আরেকটি সম্পূর্ণ পরিত্যক্ত ভবন, যার গায়ে ঝুলছে সতর্কবাণী—”প্রবেশ নিষেধ, ঝুঁকিপূর্ণ পরিত্যক্ত ভবন”। লোনা ধরা দেয়াল, ভেঙে পড়া ছাদ আর প্রাচীন ইটের গাঁথুনিগুলো যেন ফিসফিস করে ফেলে আসা জাঁকজমকপূর্ণ কোনো সন্ধ্যার গল্প বলছিল।

​ঐতিহ্য ও আধুনিকতার মেলবন্ধন: সুদৃশ্য জামে মসজিদ
​জমিদার বাড়ির প্রাচীন ধ্বংসাবশেষের ঠিক বিপরীত পাশে দাঁড়িয়ে আছে বর্তমানের এক নান্দনিক বিস্ময়—লাকার্তা সিকদার বাড়ি জামে মসজিদ। অতীত আর বর্তমানের এই বৈপরীত্য সত্যিই দেখার মতো। মসজিদটির প্রবেশদ্বারে মোঘল ও পারস্য স্থাপত্যের মিশ্রণে অত্যন্ত সূক্ষ্ম জ্যামিতিক এবং লতাপাতার রঙিন মোজাইক নকশা করা হয়েছে। সোনালী রঙের জানালার গ্রিলগুলোতে যে জটিল জ্যামিতিক কারুকাজ রয়েছে, তা এক পলক দেখলেই মন কেড়ে নেয়।

​চার কোণায় সুউচ্চ মিনার এবং কেন্দ্রে বিশাল প্রধান গম্বুজ নিয়ে শ্বেতপাথর ও আধুনিক টাইলসে নির্মিত এই মসজিদটি যেমন রাজকীয়, তেমনই আধ্যাত্মিক আবহ তৈরিতে অনন্য। মসজিদের ভেতর থেকে জানালার বাইরে তাকালে দেখা যায় গ্রামের সবুজ প্রকৃতির এক অপরূপ ক্যানভাস। সিকদার বংশের ধর্মপ্রাণতা এবং পরবর্তী প্রজন্মের নান্দনিক বোধের এক অনন্য স্মারক এই উপাসনালয়।

​লোকালয় ও আধ্যাত্মিকতার মিলনমেলা
​সঞ্জয় কুমার দত্ত : স্থানীয় প্রবীণদের সাথে কথা বলে জানা গেল, এই সিকদার বাড়ি কেবল ইট-পাথরের দেয়াল নয়, এটি এ অঞ্চলের মানুষের আবেগ ও সংস্কৃতির এক অবিচ্ছেদ্য অংশ। প্রতি বছর এখানে অত্যন্ত সাড়ম্বরে ঐতিহ্যবাহী ওরস শরীফ অনুষ্ঠিত হয়। সেই উৎসবকে কেন্দ্র করে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে হাজার হাজার ভক্ত, মুরিদান ও সাধারণ দর্শনার্থী এখানে সমবেত হন। তখন নিঝুম এই গ্রামটি পরিণত হয় এক টুকরো উৎসবের নগরীতে। এই ধর্মীয় সম্প্রীতি ও উৎসব স্থানীয় অর্থনীতিতেও ইতিবাচক ভূমিকা রাখছে দীর্ঘকাল ধরে।

​ফেরার পালা: কিছু ভাবনার অবকাশ
​লাকার্তা সিকদার বাড়ি থেকে যখন আমরা বিদায় নিচ্ছিলাম, তখন গোধূলির আলোয় প্রাচীন লাল ভবনটি এক মায়াবী রূপ ধারণ করেছিল। এটি শরীয়তপুর জেলার ১৬৮৭ সালের প্রাচীন গৌরব ও আভিজাত্যের এক জীবন্ত দলিল। তবে যথাযথ রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে এর প্রাচীন অংশগুলো যেভাবে বিলীন হয়ে যাচ্ছে, তা অত্যন্ত উদ্বেগজনক।

​যদি প্রত্নতাত্ত্বিক অধিদপ্তর কিংবা সরকারি-বেসরকারি উদ্যোগে এই জমিদার বাড়িটির প্রাচীন অংশ সংস্কার এবং সংরক্ষণের ব্যবস্থা করা যায়, তবে এটি কেবল শরীয়তপুরের নয়, সমগ্র বাংলাদেশের পর্যটন মানচিত্রে একটি অন্যতম প্রধান আকর্ষণীয় স্থান হিসেবে মাথা তুলে দাঁড়াবে। লাকার্তার বুকে বেঁচে থাকুক আমাদের এই ঐতিহাসিক গৌরব—এই প্রত্যাশা নিয়েই আমরা মুখ ফেরালাম ব্যস্ত শহরের দিকে।

শেয়ার করুন...




©All rights reserved Magura Protidin. 2018-2022
IT & Technical Support : BS Technology