আজ, সোমবার | ২রা মার্চ, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | সকাল ৭:৩২

ব্রেকিং নিউজ :
স্বাধীনতার মার্চ: অপারেশন সার্চলাইট থেকে বিজয়ের লাল-সবুজ পতাকা জনগণের কথা জানতে মাগুরায় ৯টি অভিযোগ বাক্স স্থাপন মাগুরায় শোভাযাত্রায় নিতাই রায় চৌধুরী ও মনোয়ার হোসেন খানের অভ্যর্থনা মাগুরায় ভিজিএফ কার্ড বণ্টন নিয়ে সংঘর্ষের ঘটনায় বিএনপির ১৪ জন গ্রেফতার মাগুরা পৌরসভার সাবেক প্রশাসকের বিরুদ্ধে আর্থিক কেলেঙ্কারির অভিযোগ আইজিপি হলেন মাগুরার সাবেক পুলিশ সুপার ভাষার জন্য ভালোবাসা মাগুরায় ভাষাসৈনিক হামিদুজ্জামান এহিয়া’র নামে সড়ক শালিখায় দুই কীটনাশক ব্যবসায়ীকে ১০ হাজার টাকা জরিমানা সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পেলেন মাগুরার এমপি নিতাই রায় চৌধুরী

৭ ডিসেম্বর মাগুরা মুক্ত দিবস: মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি বিজড়িত ঐতিহাসিক দিন

মাগুরা প্রতিদিন : ১৯৭১ সালের ৭ ডিসেম্বর পাক হানাদার বাহিনী ও রাজাকার, আলবদর আলশামস বাহিনীর হাত থেকে মুক্ত হয় মাগুরা।

এদিন মিত্রবাহিনী পাকবাহিনীর বিভিন্ন অবস্থানের ওপর হামলা করে মনস্তাত্বিকভাবে দুবূল করে ফেলে। তবে এর আগেই শ্রীপুরবাহিনী তথা আকবরবাহিনীর নেতৃত্বে এই বাহিনীর বিপুল সংখ্যক বীর মুক্তিযোদ্ধা নিজনান্দুয়ালি হয়ে শহর অভিমেুখে অগ্রসর হতে থাকে। আগের রাতেই অধিনায়ক আকবর হোসেন ও মোল্লা নবুয়ত আলীর নেতৃত্বে পরিকল্পনা মোতাবেক বিপুল সংখ্যক মুক্তিযোদ্ধা নিজনান্দুয়ালিতে অ্যাম্বুশ করে থাকে। এ ছাড়া আশে পাশে দুরবর্তী গ্রামের বিভিন্ন দুর্গম গ্রামে এফএফসহ অন্যান্য গ্রাপ অবস্থান করতে থাকে। ৮ ডিসেম্বর মেজর এস মুখার্জ্জির নেতৃত্বে মিত্রবাহিনী ট্যাংকবহর নিয়ে মাগুরা শহরে প্রবেশ করে। মিত্রবাহিনী, শ্রীপুরবাহিনী, হাজীপুরবাহিনী ও অন্যান্য মুক্তিযোদ্ধাদের সম্মিলিত আক্রমণে পাকসেনারা শহর ছেড়ে পারনান্দুয়ালী, বেলনগর হয়ে ফরিদপুরের দিকে চলে যেতে থাকে।

মাগুরাকে পাকহানাদার মুক্ত করতে মিত্রবাহিনীর পাশাপাশি অনন্য ভূমিকা পালন করে অধিনায়ক আকবর হোসেনের নেতৃত্বাধীন শ্রীপুরবাহিনী, খোন্দকার মাজেদের নেতৃত্বাধীন হাজীপুর বাহিনী। এ ছাড়াও বিভিন্ন ফ্রন্টে থাকা ইয়াকিুব বাহিনী, এফএফ, বিএলএফসহ অন্যান্য মুক্তিযোদ্ধারাও সাহসী ভূমিকা পালন করে। সামাজিক নেতারাও মাগুরা মুক্ত করতে মুক্তিযোদ্ধাদেরকে বিভিন্নভাবে সহায়তা করেন। এর আগে শ্রীপুর, মহম্মদপুর, মাগুরা এবং শালিখার বিভিন্ন জায়গাতে মুক্তিযোদ্ধাদের সাথে পাক বাহিনী এবং রাজাকারদের একাধিক ছোট-বড় যুদ্ধের ঘটনা ঘটে।

মাগুরায় মুক্তিযুদ্ধের সংগঠন ও মুক্তিকামী মানুষদের পক্ষ থেকে প্রতিরোধ গড়ে ওঠে একাত্তরের মার্চ থেকেই। ১ মার্চ ঢাকায় স্বাধীন বাংলা ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ গঠিত হলে মাগুরাতেও সেই ঢেউ এসে লাগে। ৩ মার্চ সারাদশের মতো মাগুরাতে সফলভাবে হরতাল পালিত হয়। এদিকে শেখ মুজিবুর রহমান ঢাকার রেসকোর্স ময়দানে (বর্তমানে সোহরাওয়ার্দী উদ্যান) জাতির উদ্দেশ্যে ঐতিহাসিক ৭ই মার্চের ভাষণ দেন। এরপর শুরু হয় অসহযোগ আন্দোলন। ৮ মার্চ আওয়ামী লীগের তৎকালীন মহকুমা সাধারণ সম্পাদক অ্যাড. আসাদুজ্জামানকে আহ্বায়ক এবং মহকুমা প্রশাসক ওয়ালিউল ইসলামকে সদস্য সচিব করে সর্বদলীয় সংগ্রাম পরিষদ গঠন হয়। স্বাধীনতাকামী মানুষের নেতৃত্বে মাগুরা, শ্রীপুর, শালিখা, মহাম্মদপুরে অসহযোগ আন্দোলন চলতে থাকে। বিভিন্ন সরকারি অফিসে হামলা ও অগ্নিসংযোগের ঘটনাও ঘটতে থাকে। এদিকে ছাত্রলীগ ও ছাত্র ইউনিয়নের নেতাকর্মীরা শহরের আশে পাশে ডামি রাইফেল নিয়ে সশস্ত্র প্রশিক্ষণ শুরু করে। তবে যুদ্ধের অন্তর্গত শক্তি হিসেবে কাজ করতে থাকেন এমএনএ সোহরাব হোসেন, সৈয়দ আতর আলী, মীর তৈয়ব, জলিল সর্দারসহ আরও অনেকে। ন্যাপ, সিপিবির নেতাকর্মীরা আলাদাভাবে যুদ্ধের প্রস্তুতি নিতে থাকেন।

এদিকে পাকিস্তানের সংহতি রক্ষার কারণ দেখিয়ে ও চলমান অসহযোগ আন্দোলন থামাতে ২৫ মার্চের রাত ১১:৩০টা থেকে টিক্কা খান, রাও ফরমান আলী ও খাদিম হুসেন রাজার নেতৃত্বে মধ্যরাত থেকে পাকিস্তানি বাহিনী ঢাকার নিরস্ত্র ঘুমন্ত বাঙালির উপর নির্বিচারে গণহত্যা শুরু করে। শুরু হয় মুক্তিযুদ্ধ। ২৭ মার্চ মাগুরাতে প্রশাসনের রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে অধিনায়ক আকবর হোসেন এবং মোল্লা নবুয়ত আলীর নেতৃত্বে একদল মুক্তিযোদ্ধা মাগুরাতে এসে শহরের নোমানী ময়দানের আনসার ক্যাম্প নিজেদের করায়ত্বে নেয় এবং আনুষ্ঠানিকভাবে যুদ্ধের জন্য সংগঠিত হতে থাকে। পরবর্তীতে ট্রেজারিতে হামলা চালিয়ে অস্ত্র ছিনিয়ে নেয়।

এদিকে আকবর হোসেনের দিকনির্দেশনায় হাবিলদার সাজাহান, হারেসার, জাহিদুল ইসলাম (বেলনগর), আ. ওয়াহেদ মিয়া, আবদুল মান্নানসহ আরও কয়েকজন বীর মুক্তিযোদ্ধা মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিতে ইচ্ছুক তরুণদের সশস্ত্র প্রশিক্ষণ দিতে শুরু করেন।

এদিকে ৪ এপ্রিল তাজউদ্দিন আহমদ ও ব্যারিস্টার আমিরুল ইসলাম গোপনে মাগুরায় এসে সংগ্রাম পরিষদের সঙ্গে বৈঠক করেন এবং সেদিন রাতেই তারা ভারতগামী হন। ২২ এপ্রিল পাক সেনারা ট্যাংকসহ মাগুরায় প্রবেশ করে এবং আলমখালী বাজারে সুরেন বিশ্বাস ও বাগবাড়িয়ায় লালু নামে এক ব্যক্তিকে হত্যা করে। শহরে পিটিআই, ভিটিআই, সিও অফিস, বালিকা বিদ্যালয়, নিউ কোর্ট বিল্ডিং ও সরকারি কলেজে ক্যাম্প স্থাপন করে তারা। স্থানীয় স্বাধীনতা–বিরোধীদের সহযোগিতায় শান্তি কমিটি, রাজাকার ও আলবদর গঠন করে পাকবাহিনী নৃশংসতা চালায়। মেজর হায়াত, রিজু, কবির, পীর ওবায়দুল্লাহসহ স্থানীয় দোসরদের বিভীষিকাময় ভূমিকা মাগুরাবাসীর মনে আজও দগদগে।

এ সময় গেরিলা বাহিনীগুলোর মধ্যে শ্রীপুরের আকবর বাহিনী, মহম্মদপুরের ইয়াকুব বাহিনী, মাগুরা শহরের খোন্দকার মাজেদ বাহিনী এবং মুজিব বাহিনী গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। শ্রীপুরের আকবর হোসেনের নেতৃত্বে গড়ে ওঠা বাহিনী মাগুরা–ঝিনাইদহ–কুষ্টিয়া–রাজবাড়ী–ফরিদপুর অঞ্চলের বিভিন্ন জায়গাতে আক্রমণ ও অভিযান চালিয়ে পাকবাহিনীর অবস্থান দুর্বল করে তোলে।
ডিসেম্বরের শুরুতে যশোর–মাগুরা অঞ্চলে যুদ্ধে নাটকীয় পরিবর্তন আসে। ৩ ডিসেম্বর মিত্রবাহিনী বিভিন্ন রুটে বাংলাদেশে প্রবেশ করে। ৪ ডিসেম্বর আকবর হোসেন পাকবাহিনীর অবস্থানের মানচিত্র তৈরি করে মিত্রবাহিনীকে দেন—এ অনুযায়ী ওয়ারলেস ভবনের পাশে বোমাবর্ষণে ২৫০ পাকসেনা নিহত ও ৮৭ জন আহত হলে পাকিস্তান বাহিনী ছত্রভঙ্গ হয়ে পড়ে।

৬ ডিসেম্বর শ্রীকোলে তিন পাকসেনা মুক্তিবাহিনীর হাতে আটক হয়। এরপর আকবর বাহিনী মাগুরার দিকে অগ্রসর হলেও বিমান হামলার আশঙ্কায় নিজনান্দুয়ালী এলাকায় অবস্থান নেয়। ৭ ডিসেম্বর ভোরে এই বাহিনীর কয়েকশত মুক্তিযোদ্ধা বিভিন্ন দিক দিয়ে শহরে প্রবেশ করে। মিত্রবাহিনী পিটিআই এলাকায় অবস্থান নেয় এবং শহরের নিয়ন্ত্রণ নিশ্চিত করে। পাকবাহিনী আত্মসমর্পণ না করে পারনান্দুয়ালী–বেলনগর এলাকায় আশ্রয় নেয় এবং শেল নিক্ষেপ করে কয়েকজন বেসামরিক মানুষকে হত্যা করে।

৮ ডিসেম্বর সকাল থেকে মিত্রবাহিনীর ট্যাংক মাগুরায় প্রবেশ করে। পারনান্দুয়ালী এলাকায় একটি ট্যাংক মাইনে ক্ষতিগ্রস্ত হলেও দ্রুত বিকল্প সেতু নির্মাণ করা হয়। পরে শ্রীপুর বাহিনী ও মিত্রবাহিনীর যৌথ অভিযানে পাকবাহিনী পরাজিত হয়। কিন্তু এর আগের দিন ৭ ডিসেম্বর থেকেই শত্রুমুক্ত মাগুরার জনগণ কার্যত স্বাধীনতার স্বাদ পায়।

মাগুরায় প্রতিবছরই জেলা প্রশাসনের উদ্যোগে ৭ ডিসেম্বর হানাদারমুক্ত দিবস বিশেষ উৎসাহ-উদ্দীপনার মধ্য দিয়ে পালিত হয়। কিন্তু এ বছর ২০২৫ সালে এসে স্বল্প পরিসরে র‌্যালি ও আলোচনার মধ্যে সীমাবদ্ধ হয়ে পড়েছে।

শেয়ার করুন...




©All rights reserved Magura Protidin. 2018-2022
IT & Technical Support : BS Technology