সঞ্জয় কুমার দত্ত : পাহাড়ের এক অদ্ভুত মায়া আছে, যা একবার মাথায় ঢুকলে ঘরে বসে থাকা দায় হয়ে পড়ে। শত বিপদ আর কষ্টের কথা জেনেও মনটা বারবার সেই বান্দরবানের বুনো সৌন্দর্যের কাছেই ছুটে যেতে চায়। চারদিকে মেঘ আর পাহাড়ের যে মিতালি, তা দেখার জন্য বারবার এই বুনো পথেই ফিরে আসতে হয়।
পাহাড়ের নেশা যেমন আদিম, এর রূপ ঠিক ততটাই রহস্যময় আর বিপজ্জনক। সম্প্রতি বান্দরবানের গহীন পাহাড়ে ট্রেকিং করতে গিয়ে প্রকৃতির এক রুদ্রমূর্তির মুখোমুখি হলাম। পুরো পথটাই ছিল যেন এক অগ্নিপরীক্ষা।
খাড়া পাহাড়ের উচুঁ-নীচু চড়াই-উতরাই পার হয়ে যখন পাহাড়ের সরু ‘রিজ লাইন’ ধরে হাঁটছিলাম, তখন বুকটা বারবার কেঁপে উঠছিল। দুই পাশে কয়েক হাজার ফুটের গভীর খাদ আর পায়ের নিচে মাত্র কয়েক ইঞ্চির সরু পথ—সামান্য একটু ভারসাম্য হারানো মানেই সব শেষ। বাতাসের ঝাপটায় সেই সরু পথে টিকে থাকা কতটা যে কঠিন, তা কেবল সেখানে গেলেই অনুভব করা যায়।
পাহাড়ের চূড়ার ‘রিজ লাইন’ ধরে হাঁটছিলাম, তখন মনে হচ্ছিল যেন মেঘের ওপর দিয়ে হাঁটছি। দুপাশে অসীম আকাশ আর নিচে সবুজের গালিচা মোড়ানো গভীর খাদ—এই দৃশ্য চোখে না দেখলে বিশ্বাস করা যায় না।
চৈত্র মাসের রুক্ষতাতেও বান্দরবান তার রূপ লুকায়নি। লাদমেরাগ আর জামরুন ঝর্ণায় হয়তো এই সময় জলের শব্দ নেই, কিন্তু তাদের বিশাল পাথুরে দেয়াল আর বুনো নির্জনতা এক অন্যরকম গাম্ভীর্য নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। ঝিরিপথের শুকনো পাথরগুলো রোদে ঝিকমিক করছিল, আর পাহাড়ের ভাঁজে ভাঁজে নাম না জানা বুনো ফুলের ঘ্রাণ জানান দিচ্ছিল যে প্রকৃতি এখানে কতটা জীবন্ত। পাহাড়ের এই আদিম এবং বুনো সৌন্দর্য উপভোগ করতে করতে মনে হয়, শত ক্লান্তি আর জীবনের সব ঝুঁকি এই এক পলক সবুজের কাছে তুচ্ছ। যান্ত্রিক শহরের ভিড় ঠেলে তাই বার বার মনটা ওই নীল পাহাড়ের কোলেই শান্তি খুঁজে পায়।
অনাবিল এই সুন্দরের টানেই তো বারবার ফিরে আসা।
পাহাড়ের পানিশূন্যতা যে কতটা ভয়াবহ হতে পারে, তা পানির বোতল শেষ হয়ে আসা তৃষ্ণার্ত ট্রেকার মাত্রই জানেন। এই গরমে পাহাড়ে ডিহাইড্রেশন বা হিটস্ট্রোকের ঝুঁকি যেমন থাকে, তেমনি পিচ্ছিল পাথর আর ঝুরঝুরে মাটির ধসে যেকোনো সময় বড় দুর্ঘটনা ঘটে যেতে পারে।
গহীন পাহাড়ে যেখানে মোবাইল নেটওয়ার্ক নেই, জিপিএস কাজ করে না, সেখানে পথ ভুল করা মানেই মৃত্যুর মুখোমুখি হওয়া। স্থানীয় গাইডের সাহায্য ছাড়া এই গোলকধাঁধায় পা রাখা আত্মঘাতী সিদ্ধান্তের নামান্তর।
পাহাড় আমাদের জয় করতে শেখায় ঠিকই, কিন্তু সেই জয় তখনই সার্থক হয় যখন আমরা প্রকৃতির নিয়মকে শ্রদ্ধা করে সুস্থভাবে ঘরে ফিরতে পারি।
যারা অ্যাডভেঞ্চারের খোঁজে পাহাড়ে যান, তারা দয়া করে সর্বোচ্চ সতর্কতা অবলম্বন করবেন। কারণ পাহাড় যেমন সুন্দর, তেমনই সে তার নিজের নিয়মে নির্মম।
লেখক : সঞ্জয় কুমার দত্ত, পর্যটক, ব্যাংকার।