মাগুরা প্রতিদিন, ০৬ সেপ্টেম্বর : ভাষা, সাহিত্য, সংগীত ও লোকঐতিহ্যের গভীর বন্ধন বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ককে অন্য মাত্রা দিয়েছে। দুই দেশের মানুষের এই অভিন্ন সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যই পারস্পরিক সম্প্রীতির সবচেয়ে বড় শক্তি বলে মন্তব্য করেছেন সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রী নিতাই রায় চৌধুরী।
রোববার সকালে সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়ে বাংলাদেশে নিযুক্ত ভারতীয় হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদীর সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাতে তিনি এসব কথা বলেন। প্রায় এক ঘণ্টার বৈঠকে দুই দেশের ঐতিহাসিক ও সাংস্কৃতিক বন্ধন, নজরুল বর্ষ উদযাপন, শিল্পী ও গবেষক বিনিময়, ক্ল্যাসিক্যাল সংগীত, লোকসংস্কৃতি, তরুণ প্রতিভা বিকাশ এবং সামুদ্রিক সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য সংরক্ষণে যৌথ উদ্যোগ নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়।
নিতাই রায় চৌধুরী বলেন, বাংলাদেশ ও ভারতের সম্পর্ক কেবল প্রতিবেশী রাষ্ট্রের নয়, এটি আত্মার সম্পর্ক। দুই দেশের মানুষের ভাষা, সাহিত্য, সংগীত, লোকঐতিহ্য ও মানবিক মূল্যবোধের মধ্যে যে গভীর সেতুবন্ধন রয়েছে, সেটিই দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের সবচেয়ে শক্তিশালী ভিত্তি।
তিনি বলেন, ‘জাতির প্রকৃত পরিচয় তার সংস্কৃতি। সংস্কৃতি মানুষকে বিভক্ত নয়, বরং ঐক্যবদ্ধ করে।’ ধর্মীয় উগ্রবাদ, অসহিষ্ণুতা ও সাম্প্রদায়িক বিভাজনের বিরুদ্ধে সাংস্কৃতিক জাগরণকে কার্যকর প্রতিরোধ হিসেবে উল্লেখ করে দুই দেশের সম্মিলিত উদ্যোগের ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।
মন্ত্রী বলেন, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, কাজী নজরুল ইসলাম, লালন শাহ এবং বাংলা লোকসংগীত দুই দেশের অভিন্ন সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। মোহাম্মদ রফি, হেমন্ত মুখোপাধ্যায়, অলকা ইয়াগনিক ও পণ্ডিত রবিশঙ্করের শিল্পকর্মও দুই দেশের মানুষের হৃদয়ে সমানভাবে অনুরণিত হয়েছে। শিল্প ও সংস্কৃতি সীমান্তের গণ্ডি পেরিয়ে মানুষের হৃদয়ের ভাষায় কথা বলে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
চলমান নজরুল বর্ষ উপলক্ষে বাংলাদেশে আয়োজিত জাতীয় ও আন্তর্জাতিক বিভিন্ন অনুষ্ঠানে ভারতের খ্যাতিমান নজরুল গবেষক, শিল্পী ও সংস্কৃতিবিদদের অংশগ্রহণের আনুষ্ঠানিক আমন্ত্রণ জানান মন্ত্রী।
বৈঠকে সংস্কৃতি প্রতিমন্ত্রী আলী নেওয়াজ মাহমুদ খৈয়ম দুই দেশের মধ্যে একটি ক্ল্যাসিক্যাল মিউজিক নেটওয়ার্ক গড়ে তোলার প্রস্তাব দেন। প্রাথমিক পর্যায়ে ভারত থেকে দুইজন ক্ল্যাসিক্যাল শিল্পীকে আমন্ত্রণ জানিয়ে বাংলাদেশে কর্মশালা আয়োজন এবং বাংলাদেশ-ভারত সাংস্কৃতিক সহযোগিতা চুক্তি নবায়নের মাধ্যমে নতুন কর্মপরিকল্পনা গ্রহণের প্রস্তাবও দেওয়া হয়।
ভারতীয় হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদী বলেন, বাংলাদেশ ও ভারতের সম্পর্ক আত্মার সম্পর্ক। খাদ্যাভ্যাস, ভাষা, ইতিহাস, ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির বহু ক্ষেত্রে দুই দেশের গভীর অভিন্নতা রয়েছে।
কাজী নজরুল ইসলামের জন্মস্থান পশ্চিমবঙ্গের চুরুলিয়ায় আরও বড় পরিসরে আন্তর্জাতিক মানের অনুষ্ঠান আয়োজনের ক্ষেত্রে সহযোগিতার আশ্বাস দেন তিনি। ওই আয়োজনে ব্যক্তিগতভাবে উপস্থিত থাকার ইচ্ছাও প্রকাশ করেন হাইকমিশনার।
তিনি বলেন, দুই দেশের তরুণ প্রতিভাদের জন্য যৌথ প্রশিক্ষণ, রেসিডেন্সি প্রোগ্রাম ও সাংস্কৃতিক বিনিময় চালু করা গেলে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের মধ্যে পারস্পরিক বোঝাপড়া আরও সুদৃঢ় হবে। বঙ্গোপসাগরকে কেন্দ্র করে সামুদ্রিক সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য সংরক্ষণে যৌথ গবেষণা ও সাংস্কৃতিক উদ্যোগ নেওয়ার সুযোগ রয়েছে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
বৈঠকে সংস্কৃতি সচিব ইয়াসমিন বেগম, মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিব, ভারতীয় হাইকমিশনের ডেপুটি হাইকমিশনার এবং ইন্দিরা গান্ধী কালচারাল সেন্টারের পরিচালকসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
বৈঠকের শেষে পারস্পরিক শ্রদ্ধা, সম্প্রীতি ও অভিন্ন সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের ভিত্তিতে বাংলাদেশ-ভারত সাংস্কৃতিক সম্পর্ককে নতুন উচ্চতায় নেওয়ার প্রত্যয় ব্যক্ত করেন উভয় পক্ষ।