মাগুরা প্রতিদিন : মাগুরায় স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর সদর উপজেলার কাপাশহাটি খালের ১ দশমিক ৭ কিলোমিটার পুনঃখনন করতে ব্যয় করেছে ৭ লাখ ৩৪ হাজার ৮০০ টাকা। অথচ পাশের গ্রামেই কামারপাড়া খালের ১ কিলোমিটার অংশ পুনঃখননে উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন অফিসের ব্যয় ২৩ লাখ ৯৭ হাজার ২৬৬ টাকা।
এখানেই শেষ নয়, জেলার শালিখায় তারা ১ কিলোমিটার খাল খননে প্রায় ৩৩ লক্ষ টাকা ব্যয় দেখিয়েছে। এমনিভাবে বিভিন্ন উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন অফিসের মাধ্যমে জেলার ১৯ কিলোমিটার ১০৩ মিটার খাল পুনঃখননে সরকারি অর্থ নয়ছয়ের খবর পাওয়া গিয়েছে।
সারাদেশে ২০ হাজার কিলোমিটার খাল ও জলাধার খনন এবং পুনঃখনন কর্মসূচির আওতায় মাগুরায় মোট ৪১ কিলোমিটার ৩৯৫ মিটার খাল পুনঃখননের জন্যে বরাদ্দ দেওয়া হয় ৯ কোটি ১১ লাখ ৫৯ হাজার ৮৭৪ টাকা। এরমধ্যে পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) মাধ্যমে ২১ কিলোমিটার ২২০ মিটার, স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের (এলজিইডি) মাধ্যমে ১ কিলোমিটার ৩২২ মিটার এবং ত্রাণ ও পুনর্বাসন মন্ত্রণালয়ের অধীনে চার উপজেলার প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তাদের মাধ্যমে ১৯ কিলোমিটার ১০৩ মিটার খাল পুনঃখনন করা হয়েছে।
তবে জেলার বিভিন্ন দপ্তরের মাধ্যমে বাস্তবায়িত এসব খাল পুনঃখননে কিলোমিটারপ্রতি ব্যয়ের বড় ধরনের পার্থক্য নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। কোথাও বরাদ্দের বড় অংশ অব্যয়িত দেখিয়ে ফেরত দেওয়া হলেও, তুলনামূলক বেশি ব্যয়ে খাল পুনঃখনন করা হয়েছে বলে জানা গেছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, সাধারণত পাউবো ও এলজিইডি দরপত্রের মাধ্যমে নির্বাচিত ঠিকাদারদের দিয়ে খাল খনন বা পুনঃখনন করে থাকে। তবে প্রধানমন্ত্রীর ঘোষিত সারাদেশে খাল পুনঃখনন কর্মসূচির আওতায় এবার ত্রাণ ও পুনর্বাসন মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে উপজেলা প্রশাসনকে খাল পুনঃখননের দায়িত্ব দেওয়া হয়। কাজ শেষে জেলার চার উপজেলা থেকে অব্যয়িত কিছু অর্থ ফেরত দেওয়া হয়েছে। তবে একই সময়ে বিভিন্ন খাল পুনঃখননে কিলোমিটারপ্রতি ব্যয় প্রায় ২০ লাখ থেকে ৩৮ লাখ টাকা পর্যন্ত হয়েছে।
মহম্মদপুর উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন অফিস সূত্রে জানা গেছে, বাবুখালী থেকে রায়পুর ¯øুইসগেট পর্যন্ত ১৫ কিলোমিটার খাল পুনঃখননের জন্য ৩ কোটি ৮৬ লাখ ২৭ হাজার ১২ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়। অথচ ওই খালের ৬ কিলোমিটার ৭৫ মিটার অংশ গত বছর পাউবোর মাধ্যমে পুনঃখনন করা হয়। ফলে পানি উন্নয়ন বোর্ডের আপত্তির কারণে ৮ কিলোমিটার ২৫ মিটার অংশ পুনঃখনন করা হয়। এতে ব্যয় হয়েছে ১ কোটি ৬৫ লাখ ৮৫ হাজার ৭৬৭ টাকা। হিসাব অনুযায়ী, এই খাল পুনঃখননে কিলোমিটারপ্রতি ব্যয় প্রায় ২০ লাখ ১০ হাজার টাকা।
মহম্মদপুর উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা রাশেদুল হাসান বলেন, একাধিক খালের নাম পাঠানো হলেও ১৫ কিলোমিটার দৈর্ঘ্যের খালটি নির্বাচিত করে বরাদ্দ পাওয়া যায়। পরে পাউবোর অনাপত্তি পত্র না পাওয়ায় ৮ কিলোমিটার ২৫০ মিটার খনন শেষে অব্যয়িত ২ কোটি ২০ লাখ ৩৬ হাজার ৯৪৫ টাকা ফেরত দেওয়া হয়েছে।
শালিখা উপজেলায় দীঘলগ্রাম ও কাঠালবাড়িয়া খালের মোট ৫ কিলোমিটার ৫৫৩ মিটার পুনঃখননের জন্য ২ কোটি ১১ লাখ ২২ হাজার ৩৪৯ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়। এ প্রকল্পে ৫২৮ জন উপকারভোগী শ্রমিকের জন্য বরাদ্দ থাকলেও শ্রমিকের সংখ্যা কমিয়ে স্কেভেটর ব্যবহার করা হয়েছে বলে জানা গেছে। এতে খরচ কমে যাওয়ায় অব্যয়িত ২৯ লাখ ৩ হাজার ১৩৩ টাকা ফেরত দেওয়া হয়। তারপরও খাল দুটির পুনঃখননে কিলোমিটারপ্রতি ব্যয় দাঁড়িয়েছে প্রায় ৩২ লাখ ৮০ হাজার টাকা।
শ্রীপুর উপজেলায় জোকা পাগলার বাড়ির ব্রিজ থেকে ছাবিনগর অভিমুখে ২ দশমিক ৫ কিলোমিটার খাল সংস্কার ও পুনঃখননের জন্য ৬৪ লাখ ৪১ হাজার ৪১৯ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়। এর মধ্যে ৫০ লাখ ৫৬ হাজার ৫১২ টাকা ব্যয় দেখিয়ে ১৩ লাখ ৮৪ হাজার ৮৯৭ টাকা ফেরত দেওয়া হয়েছে। এখানে কিলোমিটারপ্রতি ব্যয় হয়েছে প্রায় ২০ লাখ ২২ হাজার ৬০০ টাকা।
শ্রীপুর উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা রুহুল আমিন পাপন বলেন, খালটি পুনঃখননের জন্য পাঠানো প্রাক্কলনে ব্যয় ধরা হয়েছিল ৫০ লাখ টাকা। কিন্তু সংশ্লিষ্ট দপ্তর থেকে ১৪ লাখ ৪১ হাজার ৪১৯ টাকা বেশি বরাদ্দ আসে। কাজ শেষে অব্যয়িত ১৩ লাখ ৮৪ হাজার ৮৯৭ টাকা ফেরত দেওয়া হয়েছে।
সদর উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা আবু সাইদ মন্ডল জানান, দুটি খালের টাকা একটি আইডির মাধ্যমে বরাদ্দ দেওয়া হয়। ২ দশমিক ৮ কিলোমিটার খাল পুনঃখননের জন্য প্রাক্কলিত ব্যয় হিসেবে ৬৬ লাখ টাকা চাওয়া হলেও বরাদ্দ পাওয়া যায় ৭২ লাখ ১৩ হাজার ৮৭৩ টাকা। এর মধ্যে ৫০ লাখ ১৪ হাজার ৪৭৯ টাকা ব্যয়ে খননকাজ শেষ করে অব্যয়িত প্রায় ২২ লাখ টাকা ফেরত দেওয়া হয়েছে। দুটি খালের মধ্যে ১ কিলোমিটার দীর্ঘ কামারপাড়া খালের প্রাক্কলিত মূল্য ২৩ লাখ ৯৭ হাজার ২৬৬ টাকা। এর মধ্যে ৬০ জন উপকারভোগী শ্রমিকের জন্য ১২ লাখ টাকা এবং নন-ওয়েজ (খনন যন্ত্রপাতি) খাতে ১১ লাখ ৯৭ হাজার ২৬৬ টাকা বরাদ্দ ছিল বলেও তিনি জানান।
অন্যদিকে প্রধানমন্ত্রীর খাল খনন কর্মসূচির আওতায় মাগুরা পানি উন্নয়ন বোর্ডের মাধ্যমে ২১ কিলোমিটার ২২১ মিটার দৈর্ঘ্যের ১৬টি খাল নিযুক্ত ঠিকাদারদের মাধ্যমে পুনঃখনন করা হয়েছে। এতে পুনঃখননের প্রাক্কলিত মূল্য ১ কোটি ৬৫ লাখ ২৩ হাজার টাকা। হিসাবমতে পাউবোর খাল পুনঃখননে কিলোমিটারপ্রতি ব্যয় প্রায় ৭ লাখ ৭৮ হাজার টাকা।
সরেজমিনে দেখা গেছে, পাউবো খননকাজে ঠিকাদারের মাধ্যমে মূলত স্কেভেটর ব্যবহার করেছে। অন্যদিকে এলজিইডি প্রকল্প কমিটির মাধ্যমে স্কেভেটর ও শ্রমিক ব্যবহার করে নির্ধারিত সময়ের আগেই কাজ শেষ করেছে। তবে উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন অফিসের আওতায় একই কর্মসূচিতে শ্রমিক ও স্কেভেটর ব্যবহার করেও কোনও কোনও খালে কিলোমিটারপ্রতি ব্যয় তুলনামূলকভাবে কয়েক গুণ বেশি হয়েছে। অন্যদিকে এসব কাজের মান নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন স্থানীয়রা।
পাউবোর নির্বাহী প্রকৌশলী সরোয়ার জাহান সুজন বলেন, প্রধানমন্ত্রীর খাল খনন কর্মসূচি শুরুর আগেই দরপত্র বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে ঠিকাদার নিয়োগ করা হয়। দরপত্রে স্কেভেটর ব্যবহারের কথা ছিল, ম্যানুয়াল লেবার ব্যবহারের কথা উল্লেখ ছিল না। ফলে খননকাজে অতিরিক্ত অর্থ ব্যয় হয়নি। জেলায় অন্যান্য দপ্তর খাল পুনঃখনন করলেও পাউবোর সঙ্গে তাদের কোনো সমন্বয় ছিল না। তবে সমন্বিত পরিকল্পনার মাধ্যমে খননকাজ বাস্তবায়ন করা হলে তা আরও ফলপ্রসূ হতে পারে বলে তিনি জানান।
প্রধানমন্ত্রীর গুরুত্বপূর্ণ এই খাল খনন কর্মসূচির উদ্দেশ্য ছিল জলাবদ্ধতা নিরসন, পানির ধারণক্ষমতা বৃদ্ধি, কৃষি ও স্থানীয় জলব্যবস্থার উন্নয়ন। তবে মাগুরার বিভিন্ন এলাকায় খনন করা খাল পরিদর্শন করে স্থানীয় মানুষের মধ্যে কাজের মান নিয়ে মিশ্র প্রতিক্রিয়া পাওয়া গেছে। স্থানীয় কৃষকদের কেউ কেউ জানিয়েছেন, খাল পুনঃখননের ফলে পানির ধারণক্ষমতা ও গভীরতা বেড়েছে। চলতি বর্ষা মৌসুমে এর ফলে পাট জাগ দেওয়ার সুবিধা হয়েছে। আগে দূরের স্থানে নিয়ে পাট জাগ দিতে যে অর্থ ও শ্রম ব্যয় হতো, খালের পাশে জাগ দেওয়ার সুযোগ তৈরি হওয়ায় সেই ভোগান্তি কমেছে। আবার কিছু এলাকায় অপরিকল্পিতভাবে খাল খননের কারণে কৃষিজমিতে পানি ঢুকে ফসল ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার অভিযোগও করেছেন স্থানীয়রা।
তবে সরকারের একই ধরনের কাজ বিভিন্ন দপ্তরের মাধ্যমে বাস্তবায়নে কিলোমিটারপ্রতি ব্যয়ের এত বড় পার্থক্যের কারণ অনুসন্ধানের পাশাপাশি প্রকল্পের অর্থব্যয় ও কাজের মানের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা জরুরি বলে মনে করছেন সচেতনমহল।
এ বিষয়ে মাগুরার জেলা প্রশাসক মোতাকাব্বীর আহমেদ বলেন, মাগুরায় খাল পুনঃখননে শতভাগ সফলতা পাওয়া গিয়েছে। অব্যয়িত অর্থও ফেরত দেওয়া হয়েছে। কোথায়ও কোনো অনিয়মের সুযোগ নেই। আগামীতে খাল পুনঃখননে অর্থ সাশ্রয়ের সুযোগ থাকলেও সেটি গ্রহণ করা হবে।