আজ, সোমবার | ২২শে এপ্রিল, ২০২৪ খ্রিস্টাব্দ | সকাল ১১:২৯

ব্রেকিং নিউজ :

বাঙালীর দুর্গা পূজা এবং হিন্দু ধর্মের নয় অবতার

মাগুরা প্রতিদিন : দুর্গা পূজা হিন্দু ধর্মাবলম্বিদের প্রধান উৎসব হিসাবে পালন হয়ে আসছে। বড় ছোটো সকলের জন্য এই পূজা খুবই আনন্দের হয়ে থাকে। ঢাকের তাল দিয়ে আর শিউলীর মিষ্টি গন্ধে সারাদেশে দূর্গা পূজার হওয়া বইতে থাকে। মহালয়া থেকে শুরু করে পঞ্চমী, ষষ্ঠী, সপ্তমী, অষ্টমী, নবমী, বিজয়া দশমী তে মণ্ডপে মণ্ডপে দুর্গা পূজার জমজমাট আর আনন্দে মেতে ওঠা বাঙালীদের দেখতে পাওয়া যায়।

দুর্গা পূজা পাঁচ দিন ধরে অনুষ্ঠিত হয়, মা দুর্গার পূজার সাথে সাথে একই মঞ্চে মা লক্ষী, মা সরস্বতী, শ্রী গণেশ এবং শ্রী কার্তিক দেবী দেবতাদের ও পূজা করা হয়।

এ বছর মহাষষ্ঠী ২০ অক্টোবর, ২ কার্ত্তিক, শুক্রবার। মহাসপ্তমী ২১ অক্টোবর, ৩ কার্ত্তিক, শনিবার। আর বিজয়া দশমী ২৪ অক্টোবর, ৬ কার্ত্তিক, মঙ্গলবার।

মহাসপ্তমী শনিবার পড়ায় দেবীর আগমন হবে ঘোটক অর্থাত্‍ ঘোড়ায়। শাস্ত্র অনুসারে এর ফল “ছত্র ভঙ্গ স্তুরঙ্গমে” অর্থাৎ সামাজিক, রাজনৈতিক ও সামরিক অস্থিরতা বৃদ্ধি পায়। এর ফলে রাজায়-রাজায় বা রাষ্ট্রে-রাষ্ট্রে যুদ্ধ সূচিত হয়। সামাজিক ও রাজনৈতিকস্তরে ধ্বংস ও অস্থিরতা বিরাজ করে। এক কথায় ‘ছত্রভঙ্গম’।আবার  বিজয়া দশমী মঙ্গলবার পড়ায় ২০২৩-এ দেবীর গমনও হবে ঘোটক বা ঘোড়াতেই। পঞ্জিকা মতে এ বছর দশভুজার আগমন ও গমন দুই-ই ঘোটকে বা ঘোড়ায় হওয়ায় তা অত্যন্ত অশুভ ইঙ্গিতবাহী বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

ধর্মমতে সর্বগুণসম্পন্না বিশ্বজননী দুর্গা বিভিন্ন সময় অশুভ শক্তিকে পরাজয় করার জন্য বিভিন্ন রূপ ধারণ করেছিলেন। দেবী দুর্গা ও পার্বতীয় উভয়েই আদ্যাশক্তির অন্য রূপ।

হিন্দু পুরাণ অনুযায়ী, শিব-পত্নী পার্বতীরই বিভিন্ন রূপকে বন্দনা করা হয়। দেবী পার্বতীর নয় রূপ। শরত্‍কালে নবরাত্রির নয়দিন ধরে চলে দেবী পার্বতীর নয়রূপের আরাধনা। বাঙালির কাছে এই সময় দেবী দুর্গাই কন্যাসমা উমা হিসেবে পরিচিত। সর্বগুণসম্পন্না বিশ্বজননী দুর্গা বিভিন্ন সময় অশুভ শক্তিকে পরাজয় করার জন্য বিভিন্ন রূপ ধারণ করেছিলেন। দেবী দুর্গা ও পার্বতীয় উভয়েই আদ্যাশক্তির অন্য রূপ। ঈশ্বরের মাতৃরূপের প্রকাশই হল এই আদ্যাশক্তি। দেবী পার্বতীর নয় রূপ ছাড়াও তাঁকে জগদম্বা, সীতা, রাধা, চামুণ্ডেশ্বরী, ভদ্রকালী, গুহ্যকালী, শ্মশানকালী, মহাকালী, মঙ্গলচন্ডী, মহামায়া, অপরাজিতা, সত্যভামা নামেও পরিচিত। রয়েছে আরও নাম। সব রূপই পার্বতীর আদ্যাশক্তির অন্তর্গত।

‘শ্রী বরাহপুরাণে’ হরিহর ব্রহ্মা ঋষির দ্বারা রচিত দেবী কবচে লেখা রয়েছে –
প্রথমং শৈলপুত্রী চ দ্বিতীয়ম্ ব্রহ্মচারিণী । তৃতীয়ং চন্দ্রঘণ্টেতি কুষ্মাণ্ডেতি চতুর্থকম্ ।। পঞ্চমং স্কন্দমাতেতি, ষষ্ঠম্ কাত্যায়নীতি চ। সপ্তমং কালরাত্রীতি মহাগৌরীতি চাষ্টমং।। নবমং সিদ্ধিদাত্রী চ নবদুর্গা প্রকীর্তিতাঃ ।।

দেবী শৈলপুত্রী: নবদুর্গার প্রথম রূপ হল দেবী শৈলপুত্রী। নবরাত্রির প্রথমাতে দেবী শৈলপুত্রীর পুজো করা হয়। দেবীর নামের অর্থ শৈল কন্যা। দেবীর দক্ষিণ হস্তে ত্রিশূল আর বাম হস্তে পদ্ম রয়েছে, তাই দেবীর অপর নাম শুলধারিণী। মস্তকে শোভা পায় অর্ধচন্দ্র। দক্ষকন্যা সতী দেহত্যাগের পরে পরজন্মে গিরিরাজ হিমালয় ও মেনকার ঘরে পার্বতী রূপে জন্মগ্রহণ করেন মহামায়া। শৈলরাজের কন্যারূপী দেবীকে শৈলপুত্রী বলা হয়।ভক্তদের বিশ্বাস-শৈলপুত্রীর আশীর্বাদ পাওয়া গেলে সুস্থ, রোগমুক্ত জীবন পাওয়া সম্ভব। দেবী নৈবেদ্যতে খাঁটি ঘি অর্পণ করা হয়। এই দেবীর আরাধনায় মূলাধার চক্র শুদ্ধ হয়।

দেবী ব্রহ্মচারিণী: নবরাত্রির দ্বিতীয় দিনে এই দেবীর পুজো হয়। ‘ব্রহ্ম’ শব্দের অর্থ হল তপস্যা। কথিত আছে যে—‘বেদস্তত্ত্বং তপো ব্রহ্ম’—বেদ, তত্ত্ব এবং তপ হল ‘ব্রহ্ম’ শব্দের অর্থ। মহাদেবকে স্বামী হিসেবে পেতে নারদের পরামর্শে কঠিন তপস্যা শুরু করেছিলেন দেবী পার্বতী। কঠোর তপস্যার জন্য এই রূপের নাম ব্রহ্মচারিণী। ব্রহ্মচারিণীদেবী তুষ্ট করতে ভক্তরা সাধারণত চিনি নিবেদন করে থাকেন। এতে ভক্তদের দীর্ঘায়ু আশীর্বাদ প্রদান করেন।

দেবী চন্দ্রঘন্টা: কল্যাণ ও সুমঙ্গলের প্রতীক হল দেবী পার্বতীর তৃতীয় রূপ, চন্দ্রঘণ্টা। মস্তকে শোভ পায় অর্ধচন্দ্র। তাই দেবীকে চন্দ্রঘণ্টা বলা হয়ে থাকে। গায়ের রঙ সোনার মতো উজ্জ্বল। এই দেবী দশভুজা। হাতে রয়েছে কমণ্ডলু, তরোয়াল, গদা, ত্রিশূল, রক্তপদ্ম, জপমালা, শঙ্খ. ডমরু ও ধণু। বাহন সিংহের উপর অধিষ্ঠিত। ঘণ্টার প্রচণ্ড শব্দ দিয়ে অসুরকূলকে ঘায়েল করেছিলেন তিনি। ভক্তদের বিশ্বাস, দেবী সমস্ত অশুভ শক্তির বিনাশ করেন ও যাবতীয় বাধা বিঘ্ন দূর করে থাকেন।

দেবী কুষ্মান্ডা: নবরাত্রির চতুর্থীতে কুষ্মাণ্ডা রূপকে বন্দনা করা হয়। এই দেবী সিংহবাহিনী, ত্রিনয়নী ও অষ্টভুজা। আটহাতে থাকে ধণু, সুদর্শণচক্র, রক্তপদ্ম, কমণ্ডলু, অমৃত কলস, জপমালা। শাস্ত্র মতে, এই দেবী মহাবিশ্বের স্রষ্টা। ভক্তদের জ্ঞানদানের দ্বারা বৌদ্ধিক বিকাশ ঘটাতে ও কর্মক্ষেত্রে জটিলতা দূর করতে সাহায্য করেন। নিয়ম মেনে দেবীকে মালপোয়া ভোগ অর্পণ করা হয়।

দেবী স্কন্দমাতা: নবরাত্রির পঞ্চমীর রাতে দেবীকে স্কন্দমাতা রূপে পুজো করা হয়। এই দেবীর ত্রিনয়নী, চতুর্ভুজা। পদ্ম, পুত্র কার্তিক, বরাভয় থাকে হাতে। বাহন সিংহের উপরই উপবিষ্ট দেবী। পুত্র কার্তিককে কোলে নিয়ে উপবিষ্ট এই দেবীর কৃপা পেতে ভক্তরা কলা নিবেদন করেন। দেবীর আশীর্বাদে জীবনে পরম সুখ ও শান্তি বয়ে আসে বলে হিন্দুরা বিশ্বাস করে থাকেন।

দেবী কাত্যায়নী: দেবীর এই রূপের পিছনে রয়েছে এক পৌরাণিক কাহিনি। নবরাত্রির ষষ্ঠীতে ক্যাতায়নী দেবীকে পুজো করা হয়ে থাকে। বৈদিক যুগে কাত্যান নামে এক মহাঋষি ছিলেন। তিনি চেয়েছিলেন দেবী পার্বতীর ন্যায় এক কন্যা তাঁর ঘরে আলো করে জন্মগ্রহণ করেন। সেই ইচ্ছে পূরণের জন্য তিনি দেবী পার্বতীর তপস্যা শুরু করেন। তপস্যায় তুষ্ট হয়ে কাত্যায়ণের ঘরে জন্মগ্রহণ করেন দেবী পার্বতী। দেবী পার্বতীর এই রূপ মহিষাসুর বধ করেন। তাই এই রূপকে কাত্যায়ণী। তিনি শক্তি, ধর্ম ও জাগতিক সুখের প্রতীক। তাঁর আশীর্বাদ পেতে ভক্তরা মধু নিবেদন করে থাকেন।

দেবী কালরাত্রি: মহাসপ্তমীতে দেবীর কৃষ্ণবর্ণা কালরাত্রির পুজো করা হয়ে থাকে। ত্রিনয়নী দেবীর শ্বাস ও প্রশ্বাস থেকে বেরিয়ে আসে আগুনের গোলা। এই রুদ্ররূপী দেবীর তিন হাতে থাকে অস্ত্র। এই রূপকে বলা হয় কালিকা। শাক্তমতে এই দেবী অত্যন্ত শুভ। এই দেবীর বাহন সিংহ নয়, গাধা। এখানে দেবী ত্রিশূলধারী। কালরাত্রির আশীর্বাদে জীবনের সমস্ত কুপ্রভাব বিনষ্ট হয়। এই দেবীকে গুড় নিবেদন করলে আশীর্বাদ মেলে।

দেবী মহাগৌরী: হিমালয়ের কন্যা হলেন গৌরবর্ণা। তিনি শিবকে স্বামী হিসেবে পেতে কঠোর তপস্য়া শুরু করেছিলেন। সেই তপস্যা করা সময় তিনি কৃষ্ণবর্ণ ধারণ করেছিলেন। মহাদেব তুষ্ট হলে তিনি গঙ্গাজলে স্নান করেন। সেই জলেই তাঁর কৃষ্ণবর্ণ রূপ ধুয়ে যায়। হয়ে ওঠেন উজ্জ্বল ও গৌরবর্ণা। এই রূপকেই বলা হয় মহাগৌরী। মহাঅষ্টমীর দিন সব পাপ থেকে ধুয়ে মুছে মুক্তি পাওয়ার জন্য রাতে দেবী পার্বতীর এই রূপকে পুজো করা হয়ে থাকে। এই দেবীর বাহন হল ষাঁড়। চতুর্ভুজা ও সাদা পোশাক পরিহিতা। হাতে থাকে ডমরু, ত্রিশূল, বরাভয় ও পদ্ম। তাঁর নৈবেদ্যতে নারকেল রাখার রীতি।

দেবী সিদ্ধিদাত্রী: দেবীভাগবত পুরাণে উল্লেখ, রয়েছে, মহাদেব দেবী পার্বতীকে সিদ্ধিদাত্রী রূপে পুজো করেছিলেন। তারফলেই মহাদিদেব সব সিদ্ধি লাভ করেছিলেন। সিংহবাহিনী এই দেবী চতুর্ভুজা। এই দেবীর হাতে কোনও অস্ত্র থাকে না। চার হাতই থাকে আশীর্বাদী মুদ্রা। এই দেবীর আরাধনা করলে সুখ ও সমৃদ্ধি ভরপুর হয়ে ওঠে সংসার। প্রথা অনুসারে, সিদ্ধিদাত্রীকে ভক্তরা তিল নিবেদন করে থাকেন।
তথ্যসূত্র : টিভি নাইন বাংলা

শেয়ার করুন...




©All rights reserved Magura Protidin. 2018-2022
IT & Technical Support : BS Technology