আজ, শনিবার | ২১শে মে, ২০২২ খ্রিস্টাব্দ | বিকাল ৫:৪২

ব্রেকিং নিউজ :

আটপৌরে গৃহিনীর একান্ত ভাবনা

মাগুরা প্রতিদিন ডটকম : সাহিত্য সাংস্কৃতিক অঙ্গণের পরিচিত মুখ সুলতানা কাকলি। মাগুরা সরকারি বালিকা বিদ্যালয়ের প্রাক্তণ শিক্ষার্থি গার্ল গাইড। ভ্রমণ পিয়াসি সুলতানা কাকলি একজন মুক্ত চিন্তার মানুষ। লেখালেখিও তার প্রিয়। মাগুরা প্রতিদিনের পাঠকদের জন্যে এবার তিনি লিখেছেন আটপৌরে গৃহিনীর একান্ত ভাবনা নিয়ে।

ছোট ছোট আশা,
ছোট ছোট স্বপ্ন পূরণ
আর একটুখানি ভাল
বাসা মাখানো জীবন!

জীবন চলার পথে এর বেশি দরকার আছে কী? জীবন রথে চড়ে পথ পরিক্রমায় মাঝে মাঝে ভয়ংকর অগ্নিগিরির অগ্নুৎপাতকে পাশ কাটিয়ে চলতে হয়েছে। লোভের দন্ত বিস্তার করে যখন অবৈধ টাকার স্রোত ঘরে আসতে শুরু করেছিল, ঠিক সেই মুহুর্তে সাপের মুখে চুমু খেয়ে তা নিবৃত্ত করতে হয়েছে। অঢেল বিত্ত বৈভবের মাঝে জন্মে কি পেয়েছি? দেমাকী জীবন? হিংসা আর অহংকার? যখন ভালবাসার সাগরে ভাসতে ভাসতে অকূল দরিয়ার সফেদ ঢেউ আর বিস্তীর্ণ নীলাকাশের মাঝে হারিয়ে গেলাম, তখন নতুন করে জীবনবোধ জাগ্রত হলো।

ছোট ছোট স্বপ্ন ও আশা পূরণে সচেষ্ট হলাম আর ভালবাসার নদীতে সাঁতার শিখলাম। তখন অন্য মানুষে রূপান্তরিত হলাম। জীবনের সকল জটিলতা দূর করে শুধু খুশিতে বাঁচতে চাইলাম। গাড়ী-বাড়ী, বিত্ত-বৈভব, সোনা-চান্দি কিছুই কামনা করিনি। সারা জীবন চিকন চালের ভাত একটু মাছের ঝোলের সাথে খেয়ে তৃপ্তির ঢেঁকুর তুলেছি। নাইবা হলো পালংক, একটা চৌকি আর একটু নরম গদিঅলা বিছানায় ঘুমানো, পাকা বাথরুম ব্যবহার আর রাতের আঁধারে ভালবাসার পূরুষের কাছে সমর্পিত হয়ে সুখ নিদ্রায় সারা রাত কাটিয়ে দেয়া এটুকুই ছিল আমার সামান্যতম চাওয়া।

সংসারের যেদিকে চোখ যায়, আটপৌরে জীবনের চলার উপকরণ সমূহ চাহিদা মাফিক নিজেই পছন্দ করে কিনেছি, সাদামাটা জীবনে শুধু ওগুলি পরিপাটি করে রাখতে চেষ্টা করেছি।

খুব মনে পড়ে পুরোনো দিনের স্মৃতিগুলো।
এক মাসের বাচ্চাটা কোলে নিয়ে ছোট খুপরি টালির ঘরে আত্মীয়-স্বজন,বন্ধু-বান্ধবী বিহিন, সারা দিন একাকী বসে থাকতাম। বাচ্চাটার সাথে খুনসুটি আর তাকে মানুষ করার আশাতে দিনরাত অক্লান্ত পরিশ্রম, এই ছিল আমার জীবন। বিত্ত বৈভবের আকাঙ্খা পায়ে দলে সন্তানকে সুশিক্ষিত করাই ছিলো আমার একমাত্র লক্ষ্য।

অসৎ পথকে পরিহার করে নভেল-নাটকের মতন সৎভাবে আয় করে পরিবার প্রতিপালনের আশায় ও খুব ভোরে বেরিয়ে যেতো। সারা দিন বাচ্চাটা কোলে নিয়ে গন্ধ বিধূর ধুপের মতন পুড়তাম। একাকীত্ত্ব দূর করার জন্য শুধু ওই একবার টেলিভিশনের জন্য বায়না ধরেছিলাম।

সাংসারিক জীবনের ফেলে আসা পথে শুধু আল্লাহর মেহেরবানি অনুভব করি। জীবন চলার সাথীকে নিয়ে সংসারের বৈতরণী পার হতে আল্লাহ! ফুলের টোকার মতন কোন ব্যথা আমাকে দেননি। সেই বাচ্চা আজ বিশাল মহীরুহ হয়ে মাথার উপর দাঁড়িয়ে আছে।

আর বনের সিংহ সুবোধ বালক হয়ে নিরুপদ্রুব জীবন কাটাচ্ছে। তবুও মাঝে মাঝে তার গর্জন হৃদয়কে কম্পিত করে তোলে।

আল্লাহর সান্নিধ্য নিয়ে সুখেই আছি। শুধু চারিদিক তাকিয়ে হতাশাগ্রস্ত হই। এইতো দেখি বৈভবের দেমাগে মানুষের বাহারি ঠমক! পরক্ষণেই দেখি জেলের চোদ্দ শিঁকেয় তাদের আহাজারি জীবন! আর পরিজনদের গ্লানিকর জীবন অধ্যায়।

প্রতিবেশিরা বলে,”তুই ঘুষখোর, চোরের বউ!”ও মাঝে মাঝে আক্ষেপ করে, বিভিন্ন প্রোজেক্ট ফান্ড থেকে টু পাইসের বদৌলতে আজ সে হয়তো অর্থনৈতিক ভাবে হোমরা চোমরা বনে যেতো। তাতে মনে কি প্রশান্তি আসতো?

জানিনা। তবে চোরের বউ পরিচয়ে বাঁচতে আমি চাইনি! এজন্যই কি আভিজাত্য, বিলাসী জীবন, বিত্ত বৈভব অবলীলায় ত্যাগ করে, নির্ভীক ,অন্ধকার স্রোতস্বীনি নদীতে ঝাঁপ দিয়েছিলাম? ওহ! বনের সিংহকে রুখতে কত যে কষ্ট একমাত্র যে রুখতে পারে সেই বোঝে! সকল নারীকূলকে বলি! সৎ থাকুন! জীবনকে সৎভাবে গড়তে চেষ্টা করুন। বিত্ত-বৈভব হবে ঠিকই তবে নিজের আত্মা আমৃত্যু পর্যন্ত আপনাকে খোঁচাতে থাকবে, বলা যায়না, চোরের বউ অপবাদ নিয়ে ঘৃণিত জীবন বরণ করা লাগতেও পারে।

নারীগণ! আপনারাই পারেন, স্বামীদের দূর্নীতি করা রুখতে।
জীবন সায়াহ্নে পৌঁছে গেছি। জীবনকে খুব তারিয়ে তারিয়ে উপভোগ করি। পারলে চেনা-অচেনা, ধনী-গরীব সবাইকে আপ্যায়িত করি। সাহায্য করি। আর মাঝে মাঝে যখন জীবনের একটু বৈচিত্র্য খুঁজতে চেষ্টা করি, তখন সমমনা আমরা ক’জন কোথাও বেরিয়ে পড়ি, নিজেদের মত কিছু সময় অতিবাহিত করে শ্রান্ত দেহে, প্রফুল্ল মনে ঘরে ফিরি আর আল্লাহর নৈকট্য লাভ করে পথ চলি এবং কামনা করি, এভাবেই যেনো সকল জীবনের পরিসমাপ্তি হয়!
সুলতানা কাকলি, প্রাক্তণ গার্ল গাইড, মাগুরা সরকারি বালিকা বিদ্যালয়।

শেয়ার করুন...




©All rights reserved Magura Protidin. 2018-2022
IT & Technical Support : BS Technology