আজ, মঙ্গলবার | ৩১শে জানুয়ারি, ২০২৩ খ্রিস্টাব্দ | বিকাল ৪:৫৩


আর্জেন্টিনার মার্টিনেজ আজকেও অপ্রতিরোধ্য হয়ে উঠবেন

জাহিদ রহমান : কোপা কাপ থেকে বিশ্বকাপের মতো আলো ঝলমলে উত্তেজনাময় মঞ্চ। সেই মঞ্চে এখন ভীষণ আলোকিত এক নাম এমিলিয়ানো মার্টিনেজ। আর্জেন্টিনার গোলপোস্টের অতন্দ্রপ্রহরী। জাতীয় দলের হয়ে এ পর্যন্ত ২৪টি ম্যাচ খেলেছেন তিনি। এই বিশ্বকাপের শুরু থেকেই নিয়মিত খেলছেন তিনি। তবে ৯ ডিসেম্বর তিনি নিজেকে আরও নান্দনিকভাবে চিনিয়েছেন। তাঁর অসাধারণ সেভের কারণেই কোয়ার্টার ফাইনালে আর্জেন্টিনা শক্তিশালী প্রতিপক্ষ নেদারল্যান্ডসকে ৪-৩ গোলের ব্যবধানে পরাজিত করে সেমিফাইনালে ওঠে আসে। টাইব্রেকারে সেদিন তিনি নেদারল্যান্ডসের নেওয়া প্রথম দুটি শট দৃঢতার সাথে রুখে দেন। আর এতেই আর্জেন্টিনার জয়ের পথ প্রশস্ত হয়। কোপা কাপের পর কাতার বিশ্বকাপে এসেও মার্টিনেজ সত্যিই দেখালেন তিনি অগ্রজ গয়কোচিয়ারই প্রকৃত এক ছায়া। টাইব্রেকারে তাঁকে পরাস্ত করা অত সহজ নয়। আর্জেন্টিনার ভক্তদের কাছে তাই তিনি এখন প্রিয় এক নাম।

একজন দক্ষ গোলরক্ষকের মধ্যে পাওয়ার, নিখুঁত মুভমেন্ট, অনবদ্য স্কিল, ব্যালান্স, অসাধারণ ডাইভ করার মতো যে যে গুণাবলী থাকা দরকার তা তাঁর মধ্যে দৃশ্যমান। বিশেষজ্ঞরা বলছেন মার্টিনেজের মধ্যে এসব গুণাবলী বা উপকরণের উপস্থিতি চমৎকার। আর্জেন্টিনা তাঁকে এখন শতভাগ ভরসা করে। আজকেও তাই ক্রোয়েশিয়ার বিপক্ষে তিনি বিরাট এক ভরসার জায়গা, তিনি হবেন অপ্রতিরোধ্য। কোচ লিওনের স্কালোনির আস্থার প্রতিদান দেবেন তিনি শেষ রক্তবিন্দু দিয়ে। নিজ দলের সীমানা রাখবেন সুরক্ষিত। যেভাবে ৯০ এর বিশ্বকাপে ভীষণরকম আলোচিত হয়েছিলেন আর্জেন্টিনার গয়কোচিয়া।

আশির দশকে আর্জেন্টিনার গোলপোস্টে দাঁড়ানো নেরি পাম্পিডো এবং সার্জিও গয়কোচিয়া নিশ্চয় আমাদের স্মৃতিপট থেকে হারিয়ে যায়নি। বিশেষ করে অভিমানী চেহারার ধীর- স্থির ঠান্ডা মেজাজের গয়কোচিয়া এখনও আর্জেন্টিনা ভক্তদের হ্নদয়ে ছবির মতো আটকে আছে। ৯০ এর বিশ্বকাপে গয়কোচিয়া চীনের প্রাচীরে সদৃশ ছিলেন। তাঁকে ভেদ করা অতো সহজ ছিল না। ৯০ এর বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনার গয়কোচিয়ার বারপোস্ট আগলানো আর প্রতিপক্ষকে ফিরিয়ে দেওয়া ছিল বড় এক বিনোদন। বিশেষ করে পেনাল্টি শুট আউট ফিরিয়ে দিয়ে তিনি নতুন এক আইকোণে পরিণত হয়েছিলেন। স্মতর্ব্য যে, অসাধারণ সেব পেনাল্টি শুট ঠেকিয়ে দেওয়ার কারণেই সেবার ম্যারাডোনার দল ফাইনালে উঠেছিল। ১৯৯০ সালের ৩০ জুনের কথা মনে করা যাক। সেদিন কোয়ার্টার ফাইনালের খেলায় আর্জেন্টিনা মুখোমুখি হয়েছিল যুগোশ্লোভিয়া। টাইব্রেকারে যুগোশ্লোভিয়াকে ৩-২ গোলের ব্যবধানে পরাজিত করে আর্জেন্টিনা। সেই জয়ে মূল নায়ক ছিলেন গোলরক্ষক গয়কোচিয়া। এরপর ৪ জুলাই সেমিফাইনালে ইতালির সাথে ম্যাচও গড়ায় টাইব্রেকারে। গোলরক্ষক গয়কোচিয়ার প্রতুৎপন্নতায় এ ম্যাচে ৪-৩ গোলে জয়ী হয় আর্জেন্টিনা। সে সময় খুশির জোয়ারে ভেসেছিলেন আর্জেন্টাইন সমর্থকেরা। গয়কোচিয়া আর্জেন্টিনার কোটি কোটি ভক্তদের মন জয় করে নিয়েছিলেন সহসাই। গয়কোচিয়ার বিদায়ের পর আর্জেন্টিনার কোনো গোলরক্ষকই যে আর গোলপোস্টে দাঁড়িয়ে তেমন নির্ভরতার পরিচয় দিতে পারেনি তা বলাই বাহুল্য। বরং গোলপোস্ট নিয়ে আর্জেন্টিনার ভক্তদের আক্ষেপ থেকেই গেছে। রেকর্ডপত্র খুঁজলে দেখা যাবে শুধুমাত্র গোলরক্ষকের কারণেই আর্জেন্টিনার খেলোয়াড়দের অশ্রুসিক্ত হয়ে মাঠ ত্যাগ করতে হয়েছে।

মাঝে আর্জেন্টিনার গোলপোস্টে কিছুটা নির্ভরতা তৈরি করেছিলেন সার্জিও রোমেরিও। এরপর বিগত কয়েকবছরে ফ্রাংকো আরমানি, নাহুয়েল গুজম্যান, উইলি ক্যাবেলেরো কেউ-ই তেমন তারকাচিত পারফরমেন্স উপহার দিতে পারেনি। কিন্তু গয়কোচিয়ার ছায়া নিয়ে বোধ হয় এসেছেন আর্জেন্টিনার গোলপোস্টের নতুন প্রহরী এমিলিয়ানো মার্টিনেজ। সর্বশেষ ২০২১ সালে ৭ জুন অনুষ্ঠিত কোপা কাপের সেমিফাইনালের দিনটির কথা মনে করা যাক। সেদিনই তাঁর অসাধারণ সেইভের কারণেই আর্জেন্টিনাকে আর নতুন করে অশ্রু সিক্ত হতে হয়নি। কোপার সেমিফাইনালে আর্জেন্টিনার প্রতিপক্ষ ছিল কলম্বিয়া। ম্যাচে আর্জেন্টিনা শুরুতে লিড নিলেও কলম্বিয়ার ধারালো আক্রমণে খেলায় সমতা ফিরে আসে। শেষে ম্যাচ টাইব্রেকারে গড়ায়। বিগত দিনের অভিজ্ঞতায় আর্জেন্টিনা শিবির কিছুটা অশনি সংকেত কড়া নাড়ছিলো। কিন্ত না, গোলরক্ষক মার্টিনেজ তিন তিনটি শুট সেভ করেন নান্দনিক ভঙ্গিমায়, অসাধারণ ডাইভে। শেষে জয়ী হয় আর্জেন্টিনা। এরপর কোপা কাপে ব্রাজিলকে হারিয়ে চ্যাম্পিয়নও হয় আর্জেন্টিনা।

মার্টিনেজের জন্ম বুয়েন্স আয়ার্সের মার ডেল প্লাটাতে ৯২ সালের ২ সেপ্টেম্বরে। তবে মোটেও সোনার চামচ মুখে নিয়ে নয়, জন্ম হয়েছিল গরিব পরিবারে। যে পরিবারের নুন আনতে পান্তা ফুরাতো। মার্টিনেজ নিজ চোেখ দেখেছেন তাঁর বাবা আলবার্ট বিভিন্ন বিল শোধ করতে না পেরে কাঁদছেন। অনেক রাতেই তাদের টেবিলে খাবার থাকতো না। এ কারণেই মার্টিনেজ নিজ পরিবারের ভাগ্য বদলের শপথ নেন ছোটবেলা থেকেই। মার্টিনেজের ফুটবল ক্যারিয়ারের সূচনা হয় আর্জেন্টিনার পেশাদার ফুটবল দল অ্যাটলেটিকা ইনডিপেনডিন্টের হয়ে। এরপর তিনি ২০১১ সালে ইংল্যান্ডে এসে যোগ দেন আর্সেনালে। কিন্তু ভাষাগত (ইংরেজি একটুও না জানা) সমস্যা তাঁর চলার পথে বড় অন্তরায় হয়ে দাঁড়ায়। ভাগ্যেও যেনো গিঁট পড়ে। মাঠে নামার সুযোগ আর আসে না। তবে এরমধ্যে বিভিন্ন ক্লাবে খেলেন ধার করা গোলরক্ষক হিসেবে। এই ধারবাহিকতায় পেশাদারী ফুটবলে মার্টিনেজের মাঠে অভিষেক হয় ১২ সালের ৫ মে অক্সফোর্ড ইউনাইটেড ক্লাবের হয়ে। অক্সফোর্ড ইউনাইটেড আর্সেনাল থেকে তাঁকে ধারে (লোন) নেন। অবশ্য ২০১৯ সালে ভাগ্য কিছুটা খুলে মার্টিনেজের। আর্সেনালের হয়ে ন্যাশনাল কাপে খেলার সুযোগ পান। নানা চড়াই উৎরাই পেরিয়ে পরের বছর মার্টিনেজ বিশ মিলিয়ন ডলারের চুক্তিতে যোগ দেন ইংলিশ প্রিমিয়ার লীগের এস্টনভিলাতে। এই ক্লাবের হয়ে মাঠে তাঁর অভিষেক ঘটে সে বছরের ২০ সেপ্টেম্বর। এরপর প্রথম ম্যাচ সেফিল্ড ইউনাইটেডের বিপক্ষে খেলতে নেমেই গোলপোস্টে চমক দেখান। এ ম্যাচে তিনি একটি পেনাল্টি রুখে দেন। এস্টনভিলার হয়ে এ পর্যন্ত মোট ৮৯টি ম্যাচ খেলেছেন তিনি। আজকের গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচে গোলরক্ষক মার্টিনেজ কতোটা সাফল্য দেখাবে- সেই উত্তর মিলবে মধ্যরাতেই। তবে আজও তিনি অপ্রতিরোধ্য হয়ে উঠবেন বলেই বিশ্বাস।
জাহিদ রহমান, সম্পাদক, মাগুরা প্রতিদিন ডটকম

শেয়ার করুন...




©All rights reserved Magura Protidin. 2018-2022
IT & Technical Support : BS Technology