আজ, সোমবার | ২০শে মে, ২০২৪ খ্রিস্টাব্দ | রাত ১২:১৯

ব্রেকিং নিউজ :
নবীজীকে কটুক্তি: মাগুরার রামচন্দ্রপুর গ্রামে দুটি বাড়িতে আগুন-পুলিশের গুলিতে অর্ধশত আহত মাগুরার এমপি সাকিব আল হাসানের নামে জুয়ার ভূয়া বিজ্ঞাপন মাগুরায় ফিলিস্তিন সংহতি সমাবেশ শ্রীপুরে সমাজসেবা কার্যালয়ের অনুদানের অর্থ বিতরণ মাগুরার শ্রীপুরে দুটি আগ্নেয়াস্ত্রসহ দু’জন আটক সাংবাদিক লক্ষণ চন্দ্র মন্ডলের অন্তেস্টিক্রিয়া সম্পন্ন মহম্মদপুরে মসজিদ নির্মাণের টাকা আত্মসাতের ঘটনায় গ্রামে উত্তেজনা মাগুরায় অসহায় শিক্ষার্থীদের মধ্যে সরকারি অনুদান বিতরণ মাগুরা শহরে চারতলা ভবন থেকে লাফিয়ে অকৃতকার্য পরীক্ষার্থীর আত্মহত্যা! আবারো সিআইপি সম্মাননা পেলেন বিজনেস আইকন মাগুরার আব্দুল মুক্তাদির

এখনও টানে সেই ‘ম্যাটিনি শো’-অনন্যা হক

কালের গর্ভে হারিয়ে যায় প্রতিনিয়ত আমাদের কত বেলা-অবেলা। অতীতে হারিয়ে যায় দুঃখ, হারিয়ে যায় সুখ। তেমনই এক সুখ ছিল জীবনের কোনো এক বেলায়-সিনেমা হলে গিয়ে সিনেমা দেখা। এ অভিজ্ঞতা একেকজনের কাছে একেক রকম ভিন্ন ও বৈচিত্র্যময়। সিনেমাকে আমাদের এলাকাতে ‘ছবি’  বা ‘বই’ বলা হতো। নতুন ‘বই’ এলে এর খবর চলে যেত গ্রাম থেকে গ্রামে। শহর জুড়ে নতুন ‘বই’-এর পোস্টার লাগানো হতো। নতুন ‘বই’ বা ‘ছবি’ খবর জানাতে ভরাট কণ্ঠের এক লোক রিকসায় চড়ে শহরের এ প্রান্ত থেকে ও প্রান্তে মাইকিং করতো। চমৎকার এক কণ্ঠশ্বর, কানে আসতো-‘সগৌরবে, মাগুরা মধুমতি সিনেমা হলে চলছে… অথবা পূর্বাশাতে…..।

রাতের শোতে সাধারণত মহিলাদের জন্য যাওয়াটা খুব দুস্কর ছিল। এ কারণেই ম্যাটিনি শো বেশ জনপ্রিয়  ও নিরাপদ ছিল সবার কাছে। তখন প্রকাশ্যে সিনেমা হলে যাওয়াটা সবার জন্য অনুমতি সম্ভব হতো না। ফলে লুকিয়ে চুরিয়ে দেখার ব্যাপার ছিল। আর সময়টা বরাদ্দ ছিল দুপুর তিনটে থেকে সন্ধ্যা ছয়টা।

সে সময় সিনেমা দেখা মানে প্রতিদিনের একঘেয়ে দুপুর থেকে যেন একটা দুপুর একটু অন্যরকম করে কাটানো। আমাদের তারুণ্যে ছোট মফস্বল শহরে বিনোদনের খোরাক খুব একটা পাওয়া যেত না। সিনেমা হলে গিয়ে তাই সিনেমা দেখা ছিল এক অন্যরকম আকর্ষণ। তখন সমাজ রক্ষণশীল,পরিবারের অভিভাবকদের আচরণের  ভেতর সব কিছুতেই কড়াকড়ি আরোপের প্রবণতা। ছেলে-মেয়েদের তখন কোনো হাত খরচ  দেওয়ার কারো চিন্তাতেই আসতো না, হয়তো কিছু ব্যতিক্রম ছাড়া।

সিনেমা দেখার টিকিটের টাকা জোগাড় করাও অনেকের কাছে ছিল এক বিশাল মাথা ব্যথার বিষয়। তবুও  যেভাবেই  হোক  জোগাড় করে ফেলতো বা হয়ে যেত। কারো কারো  তো  দেখেছি  নেশার মত-পারলে প্রতিটা সিনেমা দেখতে হবে। ছেলেদের কিছু বাড়তি সুবিধা থাকতো সবসময়। তারা সংসারের বাজার সদাই থেকে টাকা বাঁচানোর চেষ্টা করতো। এবং বন্ধুদের সাথে মিলে এই সুযোগের সদ্ব্যবহার করতো।

আমরা মেয়েরা কৈশোর বেলায় খালা, ফুফুদের পিছে পিছে যাওয়ার জন্য উন্মুখ হয়ে থাকতাম। যদিও আব্বার এসবে অত্যন্ত কড়াকড়ি নিষেধ ছিল। তবুও যেদিন যাওয়ার কোনো ডাক পড়তো, কোনো বিধিনিষেধ মাথায় কাজ করতো না। তাদের সাথে লুকিয়ে সিনেমা হলে যাওয়া আমাদের কাছে অনেকটা উত্সবের মত ছিল। এরপরে কিছুটা বড় হলে সিনেমা হলে গিয়েছি ভাইবোনেরা দল বেঁধে চাঁদা তুলে।

মনে পড়ে একটা সিনেমা দেখতে গিয়েছিলাম, প্রায় দশ বারো জন ভাইবোন মিলে ছায়াবাণী সিনেমা হলে। একটি দৃশ্যে অনেক মোটা  মেয়েকে তার মা এক বিশাল খাঞ্চা ভরে খাবার গুছিয়ে খেতে দিয়ে বলছিল, মা খাও ভাল করে, তুমি দিন দিন কেমন শুকিয়ে যাচ্ছো, হাসতে হাসতে  চোখে পানি এসে গিয়েছিল। কত  ছোট  ছোট বিনোদনে তখন  হেসে গড়াগড়ি  যেতাম, যা কিনা এখন মনে কোনো রেখাপাত করবে না। জীবন এমনই, যা চলে যায় তা শুধু যায়,আর ফিরে আসে না।

মাগুরা শহরে তখন সিনেমা হল ছিল দুটো। অতি পরিচিত মধুমতি সিনেমা হল, ঠিক বাজারের কাছ ঘেঁষে। আর একটা নদীর পাড় ঘেঁষে পূর্বাশা সিনেমা হল। দুটো নামই সুন্দর এবং আকর্ষণীয়, এখন আছে জরাজীর্ণ হয়ে। অনেক পরে পুলিশ ফাঁড়ি এলাকায় ছায়াবাণী সিনেমা হলের উদ্বোধন হয়। মধুমতি সিনেমা হলের কথা স্মৃতিতে বেশি সমুজ্জ্বল হয়ে আছে। বড় হল ঘর, অনেক উঁচুতে ছাদ। মাঝে মাঝে বাঁশ, কাঠের খুঁটি, কাঠের বেঞ্চ,সামনে সাদা চারকোণা পর্দা। সিনেমা শুরুর আগে বাংলা, হিন্দি গান বাজতো। অপেক্ষার পালা শেষ করে পর্দায় ভেসে উঠতো আমাদের বহু আকাঙ্খিত সিনেমা। প্রথমেই জাতীয় সঙ্গীত। এরপর আবহ সঙ্গীতের সাথে সাথে কলাকূশলীদের নাম পর্দায়।

সিনেমা শুরু হওয়ার পর দেখতাম একদম নিরবতা। কাউকে কিছু বলতে হতো না, সবাই চুপচাপ সিনেমা দেখতে থাকতো মুগ্ধ আবেশে! আমরাও দেখতাম অধীর আগ্রহে কচি, অপরিণত মন নিয়ে। জীবন  থেকে  নেওয়া কিছু ঘটনাকে বাস্তবতা আর কল্পনার মিশেলে কেমন করে উপস্থাপন করতো নির্মাতারা দর্শকদের জন্য। তখন নামকরা অভিনেতাদের মধ্যে ছিলেন- রাজ্জাক, আজিম, বুলবুল আহমেদ, ফারুক, আলমগীর, সোহেল রানা, ওয়াসীম, আনোয়ার হোসেনসহ এমন অনেকে। আর অভিনেত্রীদের মধ্যে সুচান্দা, সুজাতা, কবরী, শাবানা, ববিতা, রোজিনা, আনোয়ারা, জয়শ্রী কবীর, অলিভিয়া প্রমুখ। আর কৌতুক চরিত্রগুলো দেখলেই হাসি পেত। এটিএম শামসুজ্জামান, রবিউল,  টেলিসামাদ, হাবা হাসমত এরকম অনেকেই মুগ্ধ অভিনয় দিয়ে সিনেমাতে আলাদা প্রাণের সঞ্চার করে রাখতেন। মনে পড়ে দুঃখের দৃশ্য দেখে আবেগে  চোখের পানি ফেলেছি অনেকবার।

হলে সব শ্রেণী পেশার মানুষ সিনেমা দেখতো একসাথে। হলে কোনো পারটিশন দিয়ে ভাগ করা ছিল না। ঐ টিকিটের ভেতরেই যা বিভেদ, আর সেভাবেই বসা। ফলে সিনেমা হলের পরিবেশ ছিল তেমনই। থাকতো সিগারেটের বিকট গন্ধ। তবুও  সে সব কারো ভ্রুক্ষেপ ছিল না। ইন্টারভেলের সময় ক্ষণিকের জন্য আলো জ্বলে উঠলে বাদাম, সাদামাটা বরফ পানির রঙিন আইসক্রিম, চাকভাজা- অমৃতের মত লাগতো। আহা জীবন!

যেখানে প্রাণের ছোঁয়া পাওয়া যায়, যেখানে নির্মল আনন্দ থাকে, কত অল্পতেই মন ভরে যেতে পারে। এসব ছিল তারই জলজ্যান্ত উদাহরণ। তাইতো কোনো অভিভাবকের বিধিনিষেধ বাঁধা দিয়ে রাখতে পারতো না, দেদারসে চলতো এসব বিনোদনের খোঁজে মানুষের ছোটাছুটি। এসবই ছিল আমাদের মত ছোট ছোট মফস্বল শহরে বেড়ে ওঠা মানুষের  দৈনন্দিন জীবন কড়চা।

সিনেমা হলে গিয়ে সিনেমা দেখা আমাদের অতীতের স্বর্ণালী দিনের এক জীবন্ত প্রতিচ্ছবি, যা কিনা কালের গর্ভে বিলীন প্রায়। শুধু মনে পড়ে হারানো অতীত, মনে পড়ে সিনেমা হলে গিয়ে জীবনের প্রতিচ্ছবি দেখার সেই দিন, ক্ষণ, পরিবেশ-যখন খুব ছোট ছোট কারণে আমরা যেমন পারতাম হাসতে, আবার  ছোট  ছোট দুঃখে তেমন পারতাম কাঁদতে। আহা জীবন! ফিরে পেতে ইচ্ছে করে এমন সোনালী অতীত।

অনন্যা হক: কবি ও লেখিকা

শেয়ার করুন...




©All rights reserved Magura Protidin. 2018-2022
IT & Technical Support : BS Technology