আজ, সোমবার | ২২শে এপ্রিল, ২০২৪ খ্রিস্টাব্দ | দুপুর ১:১২

ব্রেকিং নিউজ :

দোয়ার পাড় : শৈশবের সেই স্মৃতিময় দিন

সুলতানা কাকলি : শৈশবকালে হাটুরে রাস্তা ধরে নূতন বাজারের দিকে যেতেই শুরু হলো দোয়ার পাড় এলাকা। সে সময়ে পশ্চিমে বিশাল ফাঁকা এলাকার বুক চিরে নির্জন পায়ে চলা একটা মেঠো পথ সোজা গিয়ে দোয়াতে মিশেছে। আরেকটা উপপথ তৈরি হয়ে বায়ে বাদল সাহা আর ডাইনে নতুন বাজারে যেয়ে মিশেছে। মেঠো পথের বায়ে বিস্তীর্ণ জ্বলাভুমি, খানা-খন্দক আর ছোনের ভুঁই, সাপের আখড়া। জলাভুমিতে সর্বক্ষণ একটা তালের ডোঙ্গা বাঁধা থাকতো। মাঝে মাঝে আমরা ওই ডোঙ্গাতে চড়তে যেয়ে বিপত্তি বাঁধিয়ে হেসেই খুন হয়ে যেতাম। কেউ একজন শাপলা, ঝিনুক, শামুক, কলমি শাক তুলতে যেতো ওই তালের ডোঙ্গায় চড়ে।

মেঠো পথের ডানধারে বিচ্ছিন্ন দূরে দূরে কেবল উঠছে কয়েকটা ছোট ছোট বাড়ি। কোলাহল শুন্য এই নতুন গড়ে ওঠা বসতিতে মানুষের দেখা পাওয়া তখন খুবই কঠিন ছিলো। এলাকাটা নিরিবিলি ও শান্ত ছিলো। আম, জাম, জিয়াপতি কৈয়ে, বাবলা, বওলা, নিম, আতা আর রাস্তার দুপাশ দিয়ে আঁশটেল গাছের বন ছিলো। এগুলো ছাড়াও আরও নানান রকমের গাছ গাছালিতে ভরপুর ছিলো এলাকাটি।

গরমের তাপদাহে যখন নাভিশ্বাস উঠতো, তখন ওই এলাকাটি ভর দুপুরেও সুশীতল বাতাস বয়ে যেতো। গাছেদের ছায়ায় একদম প্রকৃতি ঠান্ডা থাকতো সারাক্ষণ। সন্ধ্যা নামার সাথে সাথে অবিরাম ঝিঁঝিঁ পোকার ডাক কানে তালা লাগিয়ে দিতো। এলাকাটা পাখিদের অভয়ারণ্য ছিলো। নির্জন ওই এলাকাটা শুধু পাখিদের নয় সকল প্রাণীকূলদের অভয়ারণ্য ছিলো।তখন মানুষের মনে এতো জটিলতা, হিংস্রতা, বাসা বাধতে পারেনি। নির্ভেজাল, পরপোকারী মানুষ সমাজে অগুনতি ছিলো। পারস্পরিক নির্ভরতায় সবাই বসবাস করতো। একটা বিষন্ন দুপুরে, বকেরা ঠ্যাং ভেঙে দোয়াতে মাছের আশায় দাঁড়িয়ে থাকতো। আমি আমেনা বু’র খোঁজে হেটে যেতাম মাঝে মাঝে ওই নির্জন মেঠো পথ বেয়ে।

আমেনা বু’র বাড়ি দুয়ার পাড়েই ছিলো। মায়ের প্রয়োজন হলে তাকে ডেকে পাঠাতো। দারুণ সহিষ্ণুতায় ভরা মন ছিলো তার। ওদিকে গেলে আরেক শ্রদ্ধেয় জনের দেখা পেতাম। দূর হতে ছিপ, টগি ঘাড়ে নিয়ে হেটে যেত সুনীল ভাই! তার ডাকে আমি ব্যস্ততা ভুলে একটু দাঁড়াতাম। দেখতাম! সাদা বক লম্বা লম্বা পা ফেলে মাছের খোঁজে এগিয়ে যাচ্ছে।

‘কিরে মনি! তোরা সবাই কেমন আছিস? বহুদিন হয় না যাওয়া তোদের ওদিকে।’ দোয়াতে টগি ফেলে তাঁকে ঘণ্টার পর ঘণ্টা মাছ ধরার আশায় অনেকবার বসে থাকতে দেখেছি। তার ধৈর্য্যর কাছে অনেকবার বকেরা হেরে গেছে। মাছ না পেয়ে গুগলি, শামুক খেয়ে ওদের সন্তষ্ট থাকতে হয়েছে। কিন্ত সুনীল ভাই কোনদিন মাছ না ধরে বাড়িতে ফেরেনি। আমার বড় ভাইও ছিলেন বিরাট মাছ শিকারী। সুনীল ভাইয়ের সাথে ছিলো তার বন্ধুত্বের সম্পর্ক। সেই হিসেবে আমাদের বাড়িতে ছিলো তার অবাধ যাতায়াত। একদম ঘরের ছেলের মতন। সরকারি চাকুরে আর গ্রামে তার জমাজমি বিস্তর ছিলো। কিন্ত কেনো যেনো তিনি বিয়ে করেননি উপযুক্ত বয়সে। শেষমেষ পৌড়ত্বে এসে ফুটফুটে সুন্দরী একটা মেয়েকে বিয়ে করেছিলেন। দুজনে খুব সুখী ছিলেন। মাঝে মাঝে জোড় বেধে ঘুরতে বেরুতেন। তিনি আজ আর নেই।তার স্নেহের ডাক এখনও কানে বাজে।

এই দোয়ার পাড়ে বেড়াতে এলে সুনীল ভাইয়ের কথা খুব মনে পড়ে। দরি-মাগুরার সেই দোয়া আর নেই। ভরাট হয়ে গেছে। হাটুরে রাস্তা থেকে দোয়া অবধি গড়ে উঠেছে আধুনিক দালান কোঠা ঘর বাড়ি। নিস্তব্ধ শান্ত প্রকৃতিময় এলাকা এখন কোলাহলময়। জীবনের চাকা সচল রাখার জন্য ছুটছে সবাই হয়ে দিকবিদিক। নমনীয়তা, কমনীয়তার বদলে মানুষের মাঝে রুক্ষতা যেমন স্থান পেয়েছে, অবিকল প্রকৃতিও তার স্নিগ্ধতা হারিয়ে রুক্ষ হয়ে গেছে। খুব শান্ত, স্নিগ্ধ নিরুপদ্রুবে ভরা আমাদের শৈশব কাল ছিলো যা আর ফিরে আসবেনা কোনদিন! এখন সব কল্পনা ও গল্পের মতন মনে হয়।

সুলতানা কাকলি: লেখিকা এবং সাবেক গার্লসগাইড

শেয়ার করুন...




©All rights reserved Magura Protidin. 2018-2022
IT & Technical Support : BS Technology