আজ, শনিবার | ১লা আগস্ট, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | রাত ১০:৪০

ব্রেকিং নিউজ :
মাগুরায় জুলাই সনদ বাস্তবায়ন দাবিতে গণমিছিল বিশ্ব মাতৃদুগ্ধ সপ্তাহ-২০২৬ উপলক্ষে মাগুরায় র‍্যালি ও আলোচনা সভা ধ্বংসের মুখে মিরুখালীর রায়বাড়ি, বাঁচিয়ে রাখার আকুতি মাদরাসা যাওয়ার পথে নিখোঁজ শিশুকে পাওয়া গেলো কামারখালি টোলপ্লাজায় মিরপুরে যুবদল কর্মী হত্যা: মাগুরা থেকে জিয়াউর রহমান রাজু আটক মাগুরায় জেলা পুলিশের উদ্যোগে ১০ হাজার বৃক্ষরোপণ ও চারা বিতরণ কর্মসূচির উদ্বোধন কালের সাক্ষী লাকার্তা সিকদার বাড়ি: শরীয়তপুরের এক অনন্য ঐতিহাসিক উপাখ্যান পদত্যাগ করলেন রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন শালিখায় বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে যুবকের মৃত্যু মহম্মদপুরে পুকুরে ডুবে চাচাতো দুই বোনের মৃত্যু

ধ্বংসের মুখে মিরুখালীর রায়বাড়ি, বাঁচিয়ে রাখার আকুতি

সঞ্জয় কুমার দত্ত : দক্ষিণাঞ্চলের শান্ত, সুনিবিড় ছায়াঘেরা এক গ্রাম পিরোজপুরের মঠবাড়িয়া উপজেলার মিরুখালী। পিচঢালা পথ ছেড়ে গ্রামের মেঠো গন্ধ মাখানো পথে পা রাখতেই চেনা বর্তমানটা যেন মুহূর্তেই হারিয়ে যায়। চোখের সামনে ভেসে ওঠে এমন এক আঙিনা, যার বাতাসে এখনো ফিসফিস করে কথা বলে প্রায় দুশো বছরের পুরনো ইতিহাস, ঐতিহ্য আর কিছু গা ছমছমে রহস্যের গল্প। এটিই পিরোজপুরের ঐতিহ্যবাহী রায়বাড়ি, যা স্থানীয় মানুষের কাছে ‘কুলুবাড়ি’ নামেও পরিচিত। তবে ইতিহাসের এই গৌরবোজ্জ্বল অধ্যায় আজ সংস্কারের অভাবে ধ্বংসের শেষ প্রান্তে দাঁড়িয়ে।

কাদা-মাটি থেকে জমিদারি: এক অলৌকিক উত্থান
ইতিহাসের ধুলো ওড়ালে দেখা যায়, ১৮৩৬ থেকে ১৮৪০ সালের কোনো এক সময়ে বরিশালের বাবুগঞ্জ এলাকা থেকে বৃন্দাবন চন্দ্র বেপারী নামে এক সাধারণ ব্যবসায়ী এই মিরুখালী গ্রামে এসে বসতি স্থাপন করেন। প্রথমে চুনের ব্যবসা, আর পরে নারিকেল তেলের কারখানা দিয়ে তাঁর ভাগ্যের চাকা ঘুরতে শুরু করে। তেলের ব্যবসার কারণে স্থানীয় মানুষের মুখে মুখে এই পরিবারটির পরিচয় হয়ে যায় ‘কুলুবাড়ি’।

এই বংশের জমিদারি পত্তন ও বিত্তের পেছনে এক রোমাঞ্চকর লোকশ্রুতি জড়িয়ে আছে। শোনা যায়, বৃন্দাবন চন্দ্র একবার কলকাতায় তেল বিক্রি করে পাওয়া রৌপ্যমুদ্রা ভর্তি থলে ভুলবশত নৌকার পাটাতনের নিচে রেখে এসেছিলেন। পরে সেই অর্থ যখন অক্ষত অবস্থায় উদ্ধার হয়, তখন চারদিকে রটে যায় যে তাঁরা বিশাল এক ‘গুপ্তধন’ পেয়েছেন। তবে শুধু লোকশ্রুতিই নয়, তাঁদের কঠোর পরিশ্রম আর ব্যবসায়িক বুদ্ধির জোরেই বৃন্দাবনের বড় ছেলে পূর্ণচন্দ্র রায় তৎকালীন জমিদারদের কাছ থেকে এই অঞ্চলের জমিদারি পত্তন লাভ করেন। আর জমিদারি পাওয়ার পর তাঁদের ‘বেপারী’ বা ‘কুলু’ পদবি বদলে যায় এক আভিজাত্যপূর্ণ উপাধিতে—তাঁরা হন ‘রায়’।

ব্রিটিশ আমলের স্থাপত্য আর রাজস্থানি কারিগরের জাদুস্পর্শ
জমিদারবাড়ির প্রাঙ্গণে পা রাখতেই সবার আগে চোখ জুড়িয়ে যায় এক অনন্য স্থাপত্যকলার দিকে। ১৯০৫ সালে জমিদার পূর্ণচন্দ্র রায় সাড়ে ৩২ হাত দৈর্ঘ্য এবং সাড়ে ২১ হাত প্রস্থের এক দৃষ্টিনন্দন একতলা দুর্গামন্দির নির্মাণ করেন। পুরো রায়বাড়ির মূল প্রাসাদ যখন কালের বিবর্তনে ধ্বংসের মুখোমুখি, তখন এই মন্দিরটি অতীতের সব জৌলুশের জীবন্ত সাক্ষী হয়ে আজও সগৌরবে দাঁড়িয়ে আছে।

তৎকালীন সময়ে এই মন্দিরের নিখাঁত দেয়ালচিত্র আর নকশা তৈরির জন্য সুদূর ভারতের রাজস্থান থেকে দক্ষ কারিগর নিয়ে আসা হয়েছিল। চুন-সুরকি আর ইটের সুনিপুণ গাঁথুনিতে পুরো মন্দিরজুড়ে তাঁরা ফুটিয়ে তুলেছেন চোখধাঁধানো এক রাজকীয় আবহ। মন্দিরের মূল আকর্ষণ এর প্রবেশদ্বার। ভেতরের কুঠুরিতে ঢোকার জন্য রয়েছে আটটি ধাপের একটি বিশেষ সিঁড়ি, যার দুই পাশ হাতির শুঁড়ের মতো বাঁকানো চমৎকার শিল্পকর্মে সুশোভিত। আরও একটি বিস্ময়কর বিষয় হলো, সিঁড়ির সৌন্দর্য বাড়াতে সেই যুগে চিনামাটির থালা বা কোসন ভেঙে তার টুকরো অত্যন্ত নিখুঁতভাবে ব্যবহার করা হয়েছিল।

জমিদারি আমলে এই দুর্গামন্দিরকে কেন্দ্র করে বসত রাজকীয় উৎসবের আসর। শারদীয় দুর্গাপূজায় ঢাকের আওয়াজে মুখরিত হতো চারপাশ, চলত জাঁকজমকপূর্ণ মহিষ বলি। রায় পরিবারের প্রতাপ তখন এই অঞ্চলে এতটাই ছিল যে, সাধারণ মানুষের জন্য এই মন্দিরের সামনে দিয়ে জুতো পায়ে কিংবা মাথায় ছাতা দিয়ে হাঁটা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ ছিল।

লাল ইটের কঙ্কাল ও রহস্যময় সুড়ঙ্গের হাতছানি
মন্দিরটির ঘোর লাগা সৌন্দর্য পার হয়ে একটু ভেতরের দিকে এগোলেই চোখে পড়ে মূল জমিদারবাড়ির কঙ্কালসার রূপ। ১৯০৫ সালে নির্মিত সেই বিশাল দোতলা প্রাসাদটি আজ জরাজীর্ণ। নিচতলার খিলান আকৃতির নান্দনিক প্রবেশদ্বার এবং লোহার গ্রিল ও কাঠের জানালার চমৎকার কম্বিনেশন এখনো কোনোমতে টিকে আছে, তবে ওপরের তলাটি আংশিক ভেঙে পড়েছে।

ঠিক পাশেই রয়েছে আরেকটি সম্পূর্ণ abandoned বা পরিত্যক্ত মূল প্রাসাদ, যা পুরোপুরি ধ্বংসের মুখে। লাল ইটের দেয়াল চিরে জেগে উঠেছে বড় বড় গাছপালা আর লতাগুল্ম। ছাদ ধসে পড়েছে, প্লাস্টার খসে গিয়ে কঙ্কালের মতো দাঁড়িয়ে আছে ইতিহাস।

এই ধ্বংসাবশেষের পেছনেই লুকিয়ে আছে আসল রোমাঞ্চ। ভবনগুলোর একটির তলদেশে রয়েছে একটি রহস্যময় সুড়ঙ্গ, যার এক পাশ থেকে অন্য পাশ পরিষ্কার দেখা যায়। আবার মূল ভবনের ঠিক ভেতরেই রয়েছে এক ঘোর অন্ধকার কূপ। লোকমুখে প্রচলিত আছে, জমিদারি আমলে নাকি অপরাধী প্রজাদের ধরে এনে এই অন্ধকার কূপে ফেলে শাস্তি দেওয়া হতো। যদিও এর কোনো বাস্তব ভিত্তি পাওয়া যায়নি, তবুও এই নিঝুম দুপুরে কূপটির দিকে তাকালে এক অন্যরকম শিহরণ অনুভূত হয়।

রায়বাড়ির চারপাশ ঘিরে রয়েছে আরও বেশ কয়েকটি ঐতিহাসিক মঠ ও স্মৃতিস্তম্ভ। রাস্তার ঠিক পাশে দাঁড়িয়ে আছে শতাব্দী প্রাচীন, তিন চূড়াবিশিষ্ট ত্রিশূল আকৃতির একটি কালো ও জরাজীর্ণ মঠ, যা প্রকৃতির সাথে মিশে গিয়ে এক অপার্থিব ভৌতিক সৌন্দর্য ধারণ করেছে।

জনসেবার ইতিহাস ও সংরক্ষণের আকুতি
রায় পরিবার শুধু শাসনই করেনি, এলাকার সামাজিক ও অর্থনৈতিক উন্নয়নে মিরুখালী মাধ্যমিক বিদ্যালয় এবং বাজার প্রতিষ্ঠা সহ বহু জনহিতৈষী কাজ করে গেছেন। বিশেষ করে জমিদার বংশের নলিনী রঞ্জন রায় এলাকার সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বজায় রাখতে অনন্য ভূমিকা রেখেছিলেন, যার কারণে স্থানীয় মুসলিম পরিবারগুলোর সঙ্গেও তাঁদের ছিল গভীর সুসম্পর্ক।

কিন্তু কালের বিবর্তনে আজ এই সুরম্য ভবনগুলো সংস্কারের অভাবে ধ্বংসের শেষ প্রান্তে। রায় বংশের বর্তমান বংশধর পংকজ রায় আক্ষেপ করে জানান, এ অঞ্চলে এমন নান্দনিক স্থাপনা দ্বিতীয়টি নেই, অথচ অভাবের কারণে নিজের পূর্বপুরুষদের স্মৃতি রক্ষা করার সামর্থ্য তাঁদের নেই।

তবে আশার কথা হলো, রায়বাড়ির ষষ্ঠ পুরুষ তুষারকান্তি রায় (সহকারী পরিচালক, ভূতাত্ত্বিক জরিপ অধিদপ্তর) তাঁর পূর্বপুরুষদের ইতিহাস নতুন করে রচনার কাজ হাতে নিয়েছেন। পাশাপাশি, ঐতিহাসিক দুর্গামন্দিরটি ইতিমধ্যে সংস্কার ও সংরক্ষণ করা হচ্ছে, যার ফলে এটি এখন এই অঞ্চলের অন্যতম প্রধান আকর্ষণীয় দর্শনীয় স্থানে পরিণত হয়েছে। পিরোজপুরের তৎকালীন জেলা প্রশাসনও আশ্বাস দিয়েছিল যে, প্রয়োজনীয় আবেদন পেলে পুরো বাড়িটিকে পুরাকীর্তি হিসেবে গেজেট প্রকাশ করে সরকারিভাবে সংস্কারের উদ্যোগ নেওয়া হবে।

মিরুখালীর এই রায়বাড়িতে কাটানো একটি দুপুর আপনাকে এক নিমেষে নিয়ে যাবে শত বছর আগের কোনো এক জাঁকজমকপূর্ণ সময়ে। একদিকে ধ্বংসের করুণ সুর, অন্যদিকে সংস্কার হওয়া দুর্গামন্দির—সব মিলিয়ে এই ভ্রমণ মনের গভীরে এক দীর্ঘস্থায়ী দাগ কেটে যায়। যদি এই পুরো প্রাসাদ এবং রহস্যময় সুড়ঙ্গগুলোকে গেজেটভুক্ত করে পুরোপুরি সংস্কার করা সম্ভব হয়, তবে এটি শুধু পিরোজপুর নয়, বরং সমগ্র দক্ষিণাঞ্চলের পর্যটনে এক নতুন দিগন্তের উন্মোচন করবে। আমাদের প্রাচীন ঐতিহ্যকে হারিয়ে যাওয়ার হাত থেকে রক্ষা করতে এখন সরকারি ও বেসরকারি সমন্বিত উদ্যোগ বড্ড প্রয়োজন।
লেখক : পরিব্রাজক, ব্যাংকার

শেয়ার করুন...




©All rights reserved Magura Protidin. 2018-2022
IT & Technical Support : BS Technology