আজ, শনিবার | ২৪শে ফেব্রুয়ারি, ২০২৪ খ্রিস্টাব্দ | দুপুর ২:৩১


বিলুপ্তির পথে চাচা, ফুফু, মামা, খালা সম্পর্ক!

আসমা সিদ্দিকা মিলি : বর্তমানে অধিকাংশ দম্পতি একটি মাত্র সন্তান গ্রহণ করে থাকেন। এই প্রবণতা বেড়েই চলেছে। শহরে এইচিত্র তুলনামূলক অনেক বেশি। কেউ আবার দুটো সন্তানের বাবা মা। কারো তাই আবার দুটোই ছেলে, কখনোবা দুটোই মেয়ে সন্তান। সঙ্গত কারণেই মনে হয় চাচা, ফুফু, মামা, খালা-এই মধুর সম্পর্কগুলো হয়ত এভাবেই হারিয়ে যাবে একদিন। এই সম্পর্কগুলো যে কত মধুর এবং আত্মার সম্পর্ক  তা যেনো নতুন প্রজন্ম ভুলতে বসেছে। তার জন্য দায়ী প্রজন্ম না, দায়ী বাবা মা এবং চাচা ফুফু মামা খালারাই।

বর্তমান সমাজে মানুষ এখন ভীষণ আত্মকেন্দ্রীক। নিজের ছেলে-মেয়ে ছাড়া আর কারো সন্তানকে বাবা মায়েরা ভালোবাসতে পারে না। অথচ এক সময় বাবা-মা ৮/১০ জন সন্তানের লালন পালনের পরও নিজের ভাইবোনের সন্তান, দেবর ননদের সন্তান লালন পালন করেছেন। যৌথ বা বড় পরিবারে বড় চাচাকে অনেকেই ‘বড় আব্বা’, বড় চাচীকে ‘বড় মা’ বলে ডেকেছে। বড় চাচারাও নিজের সন্তানের মত দেখেছে ভাইয়ের সন্তানদেরকে। ফুফু খালারা তাদের ভাই বোনের ছেলে-মেয়েকে আলাদা করে দেখেননি কখনো। আর মামা তো যেমন বন্ধু, তেমনি অভিভাবকও। ছেলেমেয়েরাও এই বাড়তি ভালোবাসার সবটুকু উপভোগ করেছে শ্রদ্ধা, ভালোবাসায়। গুরুজনের প্রতি শ্রদ্ধা এমনি করেই পরিবার থেকেই শিশুরা শিখে বড় হয়েছে। দাদা বাড়ীর স্নেহ মমতার সাথে থাকতোকড়া শাসন। বাবার শাসন দুর্বল হলে চাচা পাশে এসে দাঁড়িয়েছে। পরিবারের শাসন ছিল যৌথ, ভালেবাসাও ছিল তেমনই। সন্তানেরা ও উদারতার শিক্ষা নিয়ে বড় হয়েছে। বাপ চাচার সামনে কিছু বলার সাহস, যোগ্যতা কোনটাই সন্তানের ছিল না।

আর নানা বাড়ি সেতো অন্যরকম আবদারের জায়গা। তবে নানা, মামার সীমাহীন ভালোবাসার মাঝেও শাসন ছিল না তা কিন্ত নয়। গুরুগম্ভীর রাশভারী মামাকে কিন্ত ছেলে মেয়েরা শুধু ভয়ই পায়নি, তার সীমাহীন স্নেহের ছায়াতলে ঠিক খুঁজে পেয়েছে ভালোবাসার আশ্রয়। কখনো মামা বন্ধুর মত হয়েছে। সন্তানেরাও শ্রদ্ধা ভালোবাসায় মামা চাচার পাশে থেকেছে।

যে যুগ হয়েছে বাসি সেই যুগের অনুভূতি বোঝার চেষ্টা করি। এখন প্রযুক্তিকে বন্ধু করে নতুন প্রজন্ম যেনো নিজেরাই একাকীত্বকে বরণ করেছে। অনেক  বাবা মা একটা বা দুইটা সন্তানকে শ্রেষ্ঠ সন্তান তৈরি করার স্বপ্নে সকল সম্পর্কের দরজায় তালা লাগিয়ে দিয়েছেন। যার ফল তো আমরা দেখছি। আত্মকেন্দ্রিক, স্বার্থপর, একগুঁয়ে সন্তানের সংখ্যা বাড়ছে। আবার কৃষক, দিন মজুর, ছোট-খাটো পেশার পিতার সন্তান সমাজের উচ্চপদস্হ পেশায় প্রতিষ্ঠিত হলেই ভুলে যায় নিজ শেকড়ের পরিচয়। নিজেই নিজের বাবা মার সাথে দুরত্ব তৈরি করে। সন্তানকে পরিচিত করতে চেষ্টা করে নতুন উন্নত পৃথিবীতে। ভুলে যায় কম খেয়ে, কম পরে, কম সুযোগ সুবিধায়ও বাবা-মা তাকে সুসন্তান না বানালেও সুপ্রতিষ্ঠিত করেছেন। অথচ তিনি আত্মপরিচয় ভুলে গিয়ে শুধু তার নিজ সন্তানের মঙ্গল চান। আবার প্রতিষ্ঠিত বাবা মার সন্তানেরাও জীবনে সুপ্রতিষ্ঠিত হয়ে তাদের সন্তানকে পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন করে রাখেন।

পারিবারিক বন্ধন জীবনের অনেক বড় সম্পদ। কিন্ত সেটা আমরা তা ভুলতে বসেছি। সব কিছুতেই নিজের করে ভাবার অসুস্হ প্রতিযোগিতায় ছেলে-মেয়েদের রোবটিক মানসিকতায় বড় করছি। ফলাফল হিসেবে দায়িত্ব জ্ঞানহীন স্বার্থপর এক আগামী তৈরি হচ্ছে। আর তাই দাদা-দাদী, নানা-নানী, চাচা-ফুফু, মামা-খালার প্রতি সন্তানের যেমন দায়িত্ব বোধ তৈরি হচ্ছে না, তেমনি ভালোবাসা, শ্রদ্ধাবোধও হারিয়ে যাচ্ছে।সেই সাথে নতুন প্রজন্ম জীবনের প্রতি এক ধরনের নেতিবাচক ধারণায় কখনও একঘেয়েমী আবার কখনো বিলাসিতা পূর্ণ জীবনে ছোট বড় ভুল করে জীবনটাকে অসুস্হ করে তুলছে। ঠিক তেমনি চাচা ফুফু মামা খালারাও ভাই বোনদের সন্তানকে নিজের সন্তান স্নেহ দিতে পারছে না। সব কিছু মিলিয়ে বড় গোলমেলে সম্পর্কে এগিয়ে চলেছে আমাদের ভালবাসার মধুর সম্পর্কগুলোতে। এখানে সব সম্পর্ক গুলোই দায়ী মনে হয়, তবে বাবা মায়েরা একটু বেশি দায়ী।

চাচাতো মামাতো খালাতো ফুফাতো ভাই বোনের মধ্যেও আত্মীক বন্ধন ক্রমশই আলগা হয়ে যাচ্ছে। হিংসা আর ব্যক্তিত্বের দ্বন্দ্ব তাদেরকে সম্পর্কের সুতোয় বাঁধতে পারছে না। পরস্পরের প্রতি দায়িত্ববোধ তো অনেক দুরের প্রত্যাশা। একবার ভাবুন তো, এখন আপনার দুঃখে কিংবা অসুস্হতায় সন্তান যদি পাশে না থাকে তো আর কেউ নেই। ভাই বোন কিংবা তাদের সন্তানেরা ফোন করেও আপনার খবর রাখতে চায় না। দুঃসময়েও হিসেব করে আপনি কি বা কতখানি করেছেন তাদের জন্য। আপনার কাছে টাকা থাকলে আয়া-বুয়া পাওয়া যায়, তাদের কাছ থেকে সেবা পাওয়া যায় কিন্তু সুস্থ হবার জন্য, মানসিক জোর পাবার জন্য ভালোবাসাটুকু পাওয়া যায় না। এটাই এখন বাস্তবতা।

একটা মানবিক, স্নেহ মমতা, শ্রদ্ধা ভালোবাসায় গড়ে ওঠা প্রজন্মই পারে একটি সুস্থ সমাজ তৈরি করতে। সে জন্য সুদৃঢ় পরিবার প্রথা লালন করা প্রয়োজন। তাইতো মনে হয় আবার যদি ফিরে তাকানো যেতো……….হারিয়ে যাওয়া দিনগুলোতে, সেই রক্তের বন্ধন অটুট রাখতে।
আসমা সিদ্দিকা মিলি: ডেপুটি পুলিশ কমিশনার, ডিএমপি

শেয়ার করুন...




©All rights reserved Magura Protidin. 2018-2022
IT & Technical Support : BS Technology