আজ, বুধবার | ১৭ই এপ্রিল, ২০২৪ খ্রিস্টাব্দ | রাত ১২:০২

ব্রেকিং নিউজ :
স্মৃতির আয়নায় প্রিয় শিক্ষক কাজী ফয়জুর রহমান স্মৃতির আয়নায় প্রিয় শিক্ষক কাজী ফয়জুর রহমান মাগুরা সদরে উপজেলা চেয়ারম্যান পদে ৭ শ্রীপুরে ৪ প্রার্থীর মনোনয়ন জমা বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ ও রাজনীতিক কাজী ফয়জুর রহমানের ইন্তেকাল মাগুরার শ্রীপুরে স্ত্রীকে পিটিয়ে হত্যা! শায়লা রহমান সেতুর নির্মম মৃত্যুর বিচারের দাবিতে জাসদের মানববন্ধন সমাবেশে মাগুরায় ভুল চিকিৎসায় প্রসূতি মৃত্যুর অভিযোগে মামলা-মানববন্ধন ইদ কার্ড ফেরাতে মাগুরায় “পরিবর্তন আমরাই” শ্রীপুরে ডোবা থেকে নব জাতকের মরদেহ উদ্ধার মাগুরায় ডাক্তার দম্পত্তির অস্ত্রপচারে বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রীর মৃত্যুর অভিযোগ

বীরউত্তম কমলের চোখ

লাইলা আরিয়ানী হোসেন : ৭ ডিসেম্বর। মাগুরা মুক্ত দিবসে বলছি মাগুরার দামাল ছেলেদের কথা। যদিও পুরো পরিবার মুক্তিযুদ্ধের সাথে জড়িত ছিলেন, ছিল নানা অবদান,  মুক্তিযোদ্ধা সার্টিফিকেট পাওয়া দু’জন, সিদ্দিক আহমেদ সিদ্দিকি বেবী  ও মাশরুর উল হক সিদ্দিকি কমল বীর উত্তম। বিজয়ের মাসে এই ক্ষণে বলবো, প্রজন্মের কাছে পতাকা আর মানচিত্র সমর্পণ হয় প্রতিদিনের জীবন চর্চায়। সম্প্রতি স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীতে খেতাবপ্রাপ্ত মুক্তিযোদ্ধাদের ফিলাটেলিস্টস এসোসিয়েশন অফ বাংলাদেশ (পিএবি) বীর মুক্তিযোদ্ধা কমল সিদ্দিকি বীরউত্তমসহ মোট  তিনজন বীর মুক্তিযোদ্ধাকে সম্মাননা প্রদান করেছে। অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছিল ডাকবিভাগের মেট্রোপলিটন সার্কেল অফিসের কনফারেন্স রুমে, ২৭ নভেম্বর ২০২১।
একটু বলে রাখি  বেশ আগেই ঢাকায় ধানমন্ডি ৯/এ সড়কের নামকরণ করা হয় এই বীরের নামে, বীর উত্তম কমল সিদ্দিকি সড়ক। আমরা যেন মনে রাখি, আমাদের পূর্বসূরিদের অবদান, যেন বুঝে নিতে পারি, পালন করতে পারি, তাঁদের উত্তরসূরি হিসাবে নিজেদের সব কাজ।

রূপকথা আর রাজারানির গল্প অনেক হয়েছে। বাংলা মায়ের বীর সন্তানের কথা আজ শুনবো, শোনাবো । এক মায়ের পাঁচ ছেলে, এক মেয়ে। সবাই ভাল ছাত্র, নিজ যোগ্যতায় প্রতিষ্ঠিত । কেউ দেশে, কেউ বা বিদেশে । মা এর সব থেকে ছোট যে দুই ছেলে, সিদ্ধান্ত নিলো মুক্তিযুদ্ধে যাবে। দেশের মাটিতে পাক সেনার পদচারণা তারা একটুও মানতে পারেনি । দু’জনেই চাকরি পেয়েছে, একজন বিয়ে করেছে। পরীর মত বউ। তাতে কি? সিদ্ধান্ত অটল । দুই ভাই, মা তাদের ডাকতেন  বেবী আর কমল বলে। আরও সব সমমনাদের সাথে, ঘর ছাড়ল, দেশের ডাকে । কমল যোগ দিল সশস্ত্র যুদ্ধে, বেবী নেপথ্য থেকে।

কলকাতা থেকে ট্রেনিং শেষে, ছড়িয়ে পড়লো আর সব  যোদ্ধাদের সাথে বাংলার প্রান্তরে। বেবী রয়ে গেল কলকাতা, রিলিফ ক্যাম্প এর  দায়িত্ব নিয়ে। বহু প্রাণ ঝরে গেল, বহু লাঞ্ছনা, ত্যাগ, রক্তে লাল হল সবুজ জমিন, থামেনি, দমেনি। দৃঢ় হয়েছে প্রত্যয়, আক্রমণ শক্তিশালী, শত্রুসেনা বিপর্যস্ত। বিভিন্ন  স্থানে পরাজিত পাক বাহিনী, মানসিক ভাবে দুর্বল হতে লাগলো। মুক্তিসেনার তখন বিজয় আনার নেশা দূরন্ত।

অবশেষে, ভারতীয় মিত্র বাহিনীর কাছে আত্ম সমর্পণ। বিজয় ১৬ ডিসেম্বর । না, আমাদের গল্পের বীর নায়ক কমল, তাঁর বিজয় দেখা হলনা। তার আগেই  অতর্কিত হামলা পাক বাহিনীর, যেখানে কমল এবং তার সঙ্গীরা যুদ্ধ করছিলো । ভাটিয়াপাড়া নামক স্থানে, একটা বুলেট…এসে লাগলো কমলের চোখে …

কমলকে চেন তুমি,
সুন্দর সুঠাম দেহ,
প্রদীপ্ত চোখ,
দুপুর রোদের মত,
তীব্র প্রখর।

একটা বুলেট,
কমলের ডান চোখ,
ছিঁড়ে নিয়ে গেছে।

(কবি আবু জাফর ওবায়দুল্লাহ’র  “কমলের চোখ’ কবিতা থেকে)

বুলেট নিয়ে গেছে অসাধারণ সুন্দর চোখটি । কিন্তু, কমলের সহযোদ্ধা  কর্নেল হুদা’র মনোবলে একটু আঁচড় কাটতে পারেনি । মেনে নেননি ,কমল বাঁচবেনা । প্রায় একক ইচ্ছা আর চেষ্টায় নিয়ে গেছেন  ভারত ।

সহযোদ্ধা যারা ফিরে গেছে, লাল সবুজের পতাকা হাতে, স্বাধীন বাংলার পথ ধরে, কমলের মা এর প্রশ্ন ছেলে কোথায় । কেউ মুখ লুকায়, কেউ এটা  সেটা বলে। মা এর মন জানতে চায় সত্য তথ্য । জ্ঞানহীন কমল ততক্ষণে, যুদ্ধ ক্ষেত্র থেকে নড়াইল, তারপর যশোর । সেখান থেকে ভারতের ব্যারাকপুর সামরিক হাসপাতাল, পরে, কোলকাতা কম্যান্ড  হাসপাতাল, চিকিৎসা চলতে থাকলো।

আরেক মুক্তিসেনা, আরেক ভাই বেবী। রিলিফ ক্যাম্প এ থামেনি তার কাজ । আহত মুক্তিসেনা আসছে, আসছে তাদের জন্য সাহায্য। নিরলশভাবে দায়িত্ব নিয়ে, আছে। কতদিন হল, মুখ দেখা হয়নি ছোট্ট ছেলেটার, শুধু বোন এর কাছে ছোট ছোট চিরকুট, দেশের পথে যাওয়া যোদ্ধাদের হাতে পাঠানো, যেখানে সদ্য বাবা হওয়া মানুষটির স্নেহ মাখা জিজ্ঞাসা আর শুভাশিস । দেশ সবার আগে, কাজ অনেক বাকী, মনে মনে ভাবে, আর কাজ করে, মুক্তিযোদ্ধা বেবী।

বিজয়ের জন্য যাঁদের এমন অবদান, তাদের কাছে বিজয় আসেনি সেই মুহূর্তে । বেবী কমলের মা, পরিবারের অন্য সবার মনে উৎকণ্ঠা। খবর পেল তারা বেশ কদিন পর। ছুটে গেছে কলকাতা। পাশে পেয়েছিলো তারা সেখানেও অনেক স্বজন। প্রথম বাঙ্গালী মুসলিম অভিনেত্রী বনানী চৌধুরী লিলি এবং তার স্বামী। ছিলেন ছায়ার মত,কমল ও তার পরিবার এর পাশে। জ্ঞানহীন কমল কীভাবে যেন বলেছিল তার এই মামাতো বোন এর টেলিফোন নাম্বার। যেটা সেই মুহূর্তে ছিল, অবাক করা ঘটনা।

শহীদ, আহত যোদ্ধা, আর সব অংশগ্রহণকারী সবার সম্মিলিত অর্জন বিজয়। বিজয়ের সেই মুহূর্তে তাদের অনুপস্থিতি ম্লান করেনি তৃপ্তিকে। বাড়ির  ছোটদের কাছে, গল্পের আসরে এই দুই জন খুব প্রিয় মানুষ। চিন্তা-চেতনার স্বাধীনতা, মুক্ত মনের খোরাক বই কবিতা গানের তৃষ্ণা, স্বাধীনতা মানে, শৃঙ্খলা নষ্ট নয়, এমন সব ভাবনা, ভাবতে শিখিয়েছেন এরা। মানুষের জন্য কিছু করার ইচ্ছা, অনেক বড় কাজের প্রেরণা হতে পারে, এমন স্বপ্ন ছড়িয়ে দিলেন তাঁরা তাদের উত্তরসূরিদের চোখে। যেন লাল সবুজের পতাকা বহন করে, বহুদুরে নিয়ে যাওয়ার জন্য যোগ্য করে তুললেন পরবর্তী প্রজন্মকে।

বিজয় এসেছে থাকবে, চেতনায় ভাবনায়, প্রতিদিনের যাপিত জীবনে। বেবী আর কমলের পরিবারে, থাকবে এমন আরো মুক্তিসেনার বহমান রক্তের আধারে। বিজয়ের ধারাবাহিকতা চলবে আগামীর দিনে। রুখে  দেবে অন্যায় দুরন্ত প্রতিবাদে।

“কমলের চোখ, রক্ত, হৃদপিণ্ড, ওরা কেন দিল? সে প্রশ্ন করিনি তো” …। প্রশ্ন থাকুক বিবেকের কাছে, পারছি কি, এমন অমূল্য পতাকা সমুন্নত রাখতে?

দেশের জন্য চাই আজ স্বার্থহীন ভালোবাসা।  পৃথিবীর সকল প্রান্তে ছড়িয়ে থাকা বাঙ্গালির মনে দেশপ্রেমের মতো গভীরতা।

বেবী আর কমলের গল্পটা অনেকেরই গল্প। যারা বিজয় আনতে যেয়ে ফেরেনি, সময় মত, অথবা, কোনদিন ফেরা হয়নি। আছে যারা নিভৃতচারী সূর্য সন্তান,তাদের কাছ থেকে জেনে নেব সেদিনের কথা । এমন সব কথা, অবসরে আয়োজনে বলবো প্রতিদিন । চল বলি পাশের মানুষের কানে কানে, এখনি সময় এগোতে হবে। বলি একসাথে, আমার সোনার বাংলা, আমি তোমায় ভালবাসি ।

আমাদের অভিভাবকরা যেভাবে আমাদের শিখিয়েছেন, সংস্কৃতি চর্চা, দেশ মাটি আর মানুষের কাছে থাকা তাঁদের যাপিত জীবন, সব মিলে আমাদের পরবর্তী প্রজন্ম ধারণ করতে শিখছে অস্তিত্বের ভিতরে থাকা সেই বোধটুকু। দেশে বা প্রবাসে যেখানেই থাকুক, ওদের বুকে আঁকা হয়ে গেছে বাংলাদেশের মানচিত্র । ওদের মনের ভিতরের গভীর উচ্চারণগুলো বাংলায়। ওরা জানে, বাংলার সবুজ জমিন যত রক্তে লাল হয়েছিল, সেখানে কিছু রক্ত ওদের পূর্ব পুরুষের। যুদ্ধ পরবর্তী দেশ গড়তে কিছু শ্রম, কিছু মেধা, সেখানেও আছে দাবি।

ওরা যদি ভিনদেশী ভাষায় কথাও বলে, প্রবাসী হয়ে অন্য দেশের নাগরিকও হয়, কিন্তু জানে তাদের ঐতিহ্যের কথা । জানে শিকড়ের কথা। ভালোবাসার শুরুটা নিজের থেকে হলে, সেখানে নিবেদন হয় অর্থবহ। নিজের ভাষা, দেশ, সংস্কৃতিতে ভালোবাসতে পারলে, অন্যদের প্রতিও শ্রদ্ধাশীল হওয়া সহজাত অভ্যস্ততায় পরিণত হয়।

গল্প কথায় যুদ্ধদিনের কথা, পুর্বসুরীর অর্জনের কথা প্রজন্মের সদস্যরা যত শুনবে, ততই নিজের অবস্থান বুঝতে পারবে। নিজের শিকড় জানতে পারলেই তা ধারণ বহন করে বহুদুরে নেয়া যায়। স্বকীয়তা বজায় রাখার মধ্যে একটা তৃপ্তি আছে।

পতাকাটা যোগ্য হাতে সমর্পণ হোক, মানচিত্র ঠাঁই পাক বুকের গভীরে। অস্তিত্ব জুড়ে থাক চেতনার সহজ বোধ। জীবন জুড়েই সুন্দরের চর্চা। বিজয় আসুক জীবনের প্রতিটা ক্ষেত্রে। জয় হোক শুভ চিন্তার । সকল মুক্তিযোদ্ধা, দেশ গড়ার কারিগর, সকলের প্রতি অতল শ্রদ্ধা।
লায়লা আরিয়ানী হোসেন: লেখিকা, বাংলাদেশ বেতারের ঘোষক

শেয়ার করুন...




©All rights reserved Magura Protidin. 2018-2022
IT & Technical Support : BS Technology