আজ, মঙ্গলবার | ২রা জুন, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | রাত ১:৫৫

ব্রেকিং নিউজ :
আবার বাড়লো জ্বালানি তেলের দাম মাগুরায় চোরাই ৫টি মোটরসাইকেলসহ চোর সিণ্ডিকেটের এক সদস্য গ্রেফতার দুই মহাদেশ সফরের উদ্দেশ্যে দেশ ছাড়লেন এমপি মনোয়ার খান এআই ট্রাফিক ব্যবস্থা ঘিরে নতুন প্রতারণা-বিআরটিএ-এর সতর্কবার্তা স্বর্ণজয়ী ইয়াসমিনকে শ্রীপুরে সংবর্ধনা, বালিকা ফুটবল দলও পেল পুরস্কার জঙ্গল সলিমপুরে র‍্যাব -পুলিশের ক্যাম্প বুলডোজারে গুঁড়িয়ে দিয়েছে ইয়াসিন বাহিনী তেলবোঝাই ট্রাক ছিনতাই, চালককে হত্যা—এক সপ্তাহ পর উন্মোচিত চাঞ্চল্যকর রহস্য মাত্র ১শ ২০ টাকায় পুলিশের চাকরি সংসদ ভবন থেকে উধাও ১৩৪৩ কপার বার, তদন্তে অনিয়মের অভিযোগ ঝিনাইদহ ছাত্রদল নেতার মামলায় এনসিপির কেন্দ্রীয় নেতা তারেক গ্রেফতার

আ_মরি_বাংলা_ভাষা

আফতাবুল হক বিস্ময় : দুনিয়ায় বাংলা ভাষাভাষী লোক প্রায় সাতাশ কোটি। জনসংখ্যার বিচারে সপ্তম। চাইনিজ, স্প্যানিশ, ইংলিশ,  হিন্দি, ফ্রেঞ্চ আর আরবির পরেই বাংলার অবস্থান। যেনতেন ব্যাপার না কিন্তু! এ ভাষার অধিকার আদায়ের জন্য তাজা প্রাণের রক্তে রঞ্জিত হয়েছে শিক্ষাঙ্গন, রাজপথ।

অথচ আমাদের মত করে মাতৃভাষার অযত্ন, অবহেলা, অবমাননা কেউ করে না।

সামাজিক মাধ্যমে, গ্রুপে গ্রুপে, অলিতে গলিতে, পোস্টারে নোটিশে, দেয়াল লিখনিতে, কবিতায় গানে, সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে ভুলের জয়জয়কার। এর শেষ কোথায়? যেন মাতৃভাষার জন্য কোন দায় নেই আমাদের। পরবর্তী প্রজন্ম কি শিখছে? বর্ণপরিচয়, প্রথম পাঠ, বিদ্যাসাগর, চক-স্লেট-ব্ল্যাকবোর্ড-ডাস্টার, দ্বাদশ শ্রেণী পর্যন্ত আবশ্যিক বাংলা শিক্ষা, হরলাল রায়, বাংলা স্যারের কাঁচা বেতের বাড়ি, বানান ভুল হলে নম্বর কাটা – এসব কোথায় গেল?

মেটাস্টেসিস এর মত ছড়িয়ে পড়া ভুলের একটা উদাহরণ – ‘র’ আর ‘ড়’ এর ব্যবহার। এটা দেখতে দেখতে বর্ণমালায় এ দুটি যে আলাদা অক্ষর সেটাই সবাই ভুলতে বসেছি! ‘অনিচ্ছাকৃত ভুল’ আর ‘ভুল জেনে ভুল করা’ এক নয়। হরদম সেটাই হচ্ছে।

ইদানিং রোমান্টিক আধুনিক কবিরা নবপরিণীতাকে কাছে পেয়ে কবিতা শুরু করেন –
“বাসড় ঘড়ে পেতেছি ফুলশয্যা
ওগো তারাতারি এস ভেঙে তব লজ্জা
পিড়িতের তাপে তরল হল মম হারের মজ্জা!”

কি বুঝলেন? কে আগে পালাবে? নবপরিণীতা, রোমান্স না কবিতা? যেখানে বাসর হয়ে যাচ্ছে বাসড়, ঘর কে লিখছি ঘড়, তাড়াতাড়ি কে তারাতারি, পিরিত হয়ে যাচ্ছে পিড়িত – সেখানে অনুভূতির সুন্দর প্রকাশ কিভাবে সম্ভব?

আগ্রহ নিয়ে একটা লেখা পড়ছি। শুরু হয়ে গেল ‘র’ আর ‘ড়’ এর জগাখিচুড়ি। হামেশা হয় এমন। “গাছের পাতা নরেচরে বন্ধুর কথা মনে পরে” – নড়েচড়ে বসার আগেই মনে পড়ে এ লেখা বেশি দূর পড়া যাবে না।

“সজনে পাতা ঝড়ে পরে
টুপি পড়ে মোল্লা নামাজ পরে”

পাতা ঝরে পড়ে; ঝর আর ঝড় যে ভিন্ন অর্থের সম্পূর্ণ আলাদা দুটি শব্দ তা গুলিয়ে ফেলছি। মানুষ টুপি, পোশাক, জুতো এসব পরে (পরা = to wear or to put on something)। অথবা পর্যায়ক্রমিক ঘটনার ক্ষেত্রে পরে (after) ব্যবহৃত হয়। আর নামাজ পড়ে, বই পড়ে (পড়া = to read)। আবার উপর থেকে পড়ে (to fall down, যেমন পাতা পড়ে, বৃষ্টি পড়ে) অথবা পতিত হয় (প্রেমে পড়ে, বিপদে পড়ে)। এই সহজ ক্রিয়া গুলোকে আমরা গুবলেট পাকিয়ে ফেলছি।

ভুলের স্রোতে ভেসে বেদিশা হওয়ার অবস্থা। গড্ডালিকা প্রবাহে নিমজ্জন চলছে অবিরত।

“পাকা আম গাছে ধড়ে
মুখে তাই রস ঝড়ে”
“ঝরে বক মড়ে
ফকিরের কেড়ামতি বারে”
“সাড়াদিন তারে নিয়ে করলাম ঘুড়াঘুড়ি
তবুও বন্ধু আমার সনে করে মুরামুরি”
“এই মদন ওদিকে যাসনে কুকুড়ে কামরাবে।”
“দেওয়া আয়ছে তারাতারি বারি যা”
“পারা বেরাতে গিয়ে সোয়ামির ঝারি খেলাম।”

ভুল সবই ভুল। ‘র’ এবং ‘ড়’ এর এই ভুল ব্যবহারে শব্দের মানে পাল্টে যাচ্ছে। ক্ষেত্র বিশেষে কোন মানেই হচ্ছে না। বাক্য হারাচ্ছে মাধুর্য। পুরো রচনার মান নষ্ট হচ্ছে।

অথচ এই অবিমৃশ্যকারিতা থেকে মুক্ত হতে কারো কোন গা নেই। নব্য কবি, প্রতিষ্ঠিত লেখক, গীতিকার, জনপ্রিয় ব্লগার, লাইকের বানে ভেসে যাওয়া রম্য সাহিত্যিক, নামিদামি সাংবাদিক, এমনকি শিক্ষক – সবাই নির্বিচারে, ভ্রুক্ষেপহীন ভুল লিখে যাচ্ছেন। আর আমরা আমজনতা কাঁঠালের রসে নিমজ্জিত হয়ে, ঠোঁট দাড়িগোঁফ আঠাময় করে নির্বিকারে তা গিলছি। কিউট পাঠিকারা খিলখিল করে হাসছেন। রাতদুপুরে ইনবক্সে ভীড় বাড়ছে। ‘অসাধারণ’, ‘অপূর্ব’, ‘সেরা’, ‘তুলনাহীন’, ‘নেক্সট’  – এসব বলে ভুলের অ্যামপ্লিফিকেশন এবং প্রতিষ্ঠা করে যাচ্ছি দেদারসে। কিভাবে?

ধরুন আপনি একজন জনপ্রিয় লেখক। একশ জন ফলোয়ার আপনার পোস্ট, সাহিত্যকর্ম ইত্যাদি পড়ে। তো আপনি যখন ভুল লিখছেন, তখন একশ জন ভুলটা ফলো করছে। এর মধ্যে বিশজন সেটা সঠিক ধরে তারাও ভুলটা লিখতে থাকলেন। ডিগ্রীওয়ালা স্যারে লিখেছেন, জনপ্রিয় লেখক লিখেছেন – তাহলে ওইটাই ঠিক! এই বিশজনের প্রত্যেকের আবার একশ জন ফলোয়ার – এবং এদেরও একশ জন ফলোয়ার … অঙ্ক কিন্তু বাড়ছে চক্রবৃদ্ধি হারে। এটা ভুলের অ্যামপ্লিফিকেশন বা বিস্তার। এই ভুল অতঃপর ঘুরবে ওয়ালে ওয়ালে, গ্রুপে গ্রুপে, শেয়ারে কপিতে। যত বেশি ভুল ছড়াবে তত বেশি তা জেঁকে বসবে। হবে ভুলের প্রতিষ্ঠা। এভাবে ভুল শিখে এরাই শিক্ষক হবে। পরবর্তী প্রজন্মকে পড়াবে। বড় বড় পাস দিয়ে আমলা হয়ে দেশ চালাবে। বাংলা একাডেমিতে ভাষার জিম্মাদার হবে। অদূর ভবিষ্যতে ভুলের ফাউন্ডেশনে গড়া ইমারত মৃদু ঝাঁকিতে ভেঙ্গে যাবে। তখন আর ‘কোমড়’ সোজা করে দাঁড়ানো যাবে না। গান গেয়ে বেড়াতে হবে –
“পাইলাম না বন্ধুর কোমড়ের বিছা
এ জীবনে সবই মিছা….”

সবিনয়ে ভুল ধরিয়ে দিলে কমন উত্তর – “বানান ভুল হতেই পারে”, “আমি বানানে কাঁচা”। অনুসারীরা অস্ত্র শান দিয়ে বসে থাকেন উল্টো কোপ মারার জন্য – “মনের ভাব প্রকাশ হলেই হয়েছে, বানান আবার কি?” “ব্যাকরণ বই আর ডিকশনারি হাতে নিয়ে লিখতে বসব নাকি?” “আয়ছে বিরাট পণ্ডিত সুশীল চন্দ্র … হাহা, হিহি” ইত্যাদি, ইত্যাদি। অথচ ভুল স্বীকার করে শুধরে নেয়াটাই প্রকৃত গুণীর পরিচয়।

কবিতা, গান, গল্প, উপন্যাস, প্রবন্ধ, রম্যরচনা, দরখাস্ত, মেমো, নোটিশ – এসবের মূল বিল্ডিং ব্লক শব্দ। সেই শব্দে যদি ভুল থাকে তাহলে ধরে নিতে হবে লেখকের প্রস্তুতি নেই, লেখক অমনোযোগী এবং নিজের সৃষ্টি আর ভাষার প্রতি যত্নশীল নন। অথবা ভাষাজ্ঞানের অভাব রয়েছে। জানতে হলে, শিখতে হলে, লিখতে হলে পড়তে হয় – এই  মৌলিক এবং জরুরী সমীকরণ আমরা মানি না। আমরা সবাই লিখতে চাই – কেউ পড়তে চাই না। অথচ লেখালেখির ভিত্তি গড়তে হলে পড়ার বিকল্প নেই। ‘বানান ভুল কোন ব্যাপার না’ – এটা কোন যুক্তি বা অজুহাত হতে পারে না। সহজ অ্যাপস এবং প্রযুক্তির দারুণ উন্নতি হয়েছে, প্রতিনিয়ত আপগ্রেড হচ্ছে। বাংলা লিপির সফটওয়্যার এবং ইন্টারনেট সংযোগ থাকলে সঠিক বানানের সঠিক শব্দ অঙ্গুলি-স্পর্শে খুঁজতে লাগে ত্রিশ সেকেন্ড। এগুলোর ব্যবহার জেনে সঠিক শব্দের প্রয়োগ, যারা সাহিত্য চর্চা করছেন তাদের দায়িত্ব। যেমন একসময় লিখতে হলে কলমে কালি ভরার দায়িত্ব ছিল ছাত্র, শিক্ষক, লেখক সবার।

দালান বানাতে গিয়ে তিন নম্বর ইট ব্যবহার করলেন, পিলারে রডের বদলে বাঁশের কঞ্চি দিলেন – দালান হবে? ডাক্তার এপেনডিক্স অপারেশন করতে গিয়ে কিডনী ফেলে দিলেন – রোগী বাঁচবে? কেমিস্ট সফট ড্রিঙ্কস বানাতে গিয়ে এসিড বানিয়ে ফেললেন – পান করবেন? ফাস্ট বল করতে এসে বোলার ষাট মাইল বেগে বল করা শুরু করলেন – খেলা হপে? যে কোন কাজেই প্রাথমিক ও অপরিহার্য উপকরণ ঠিক না থাকলে ক্যামনে কি?

সমস্যার মূলে হচ্ছে – সব কিছুতেই আমাদের শর্টকাটের প্রবণতা। পরিশ্রম এবং সাধনায় অনীহা। অবহেলা এবং দুই নম্বরি। দুই পাতা লিখে আমরা বিখ্যাত হতে চাই। দুই লাইন বেসুরো গান গেয়ে আমরা জাতীয় টিভিতে কোমর-ভুড়ি দুলিয়ে স্টেজ কাঁপানো শিল্পী হতে চাই। ইউটিউবে দুই মিলিয়ন ফলোয়ার চাই। দুই টাকা বিনিয়োগ করে রাতারাতি দুইশ টাকা লাভ করতে চাই। দুই বছর চাকরি করে সিইও হতে চাই। দুই দিন প্রেম নিবেদন করে লাইলি-মজনু, রোমিও-জুলিয়েট, শিরি-ফরহাদের প্রেমানুরাগ চাই। অথচ হেলাফেলায় অযত্নে গড়া কিছুর দুই পয়সা দামও যে নেই এই সত্যটা বেমালুম ভুলে যাই।

সে সময় বেশি দূরে নয় যখন একুশে পদক পাবে কবি ‘চিড়কুমাড় হালদাড়’ তার চরম জনপ্রিয় কাব্যগ্রন্থ ‘আন্ধাড় ড়াতে ভুতেড় সাথে প্রণয়’ এর জন্য। বইমেলার বেস্টসেলার হবে তুমুল জনপ্রিয় সাহিত্যিক মামুনুড় ড়শীদের প্রেমের উপন্যাস “ঘুড়ে দেখি পাখি উরে গেছে”।

যারা লেখালেখি করছেন তাদের কাছে মিনতি – নিজের কাজের প্রতি যত্নশীল হোন। ভুল বানানের ভুল শব্দে গভীর অনুভূতির কবিতাটির ছন্দপতন করবেন না। লাইনে লাইনে ভুল লিখে দারুণ প্লটের গল্পটি নষ্ট করবেন না। ভাষার প্রতি শ্রদ্ধাশীল হোন। পাঠকের প্রতি অনুরাগী হোন। ভুল জিনিসের বেইল নেই। একই সাথে পাঠকেরও দায় আছে বৈকি। প্রিয় লেখকের ভুল ধরিয়ে দিন। ভুল শব্দে কবিতা হয় না – কবিকে বলুন। লেখকদেরকে নিজের লেখা আগে পড়তে বলুন। গড়ে হরিবোল প্রশংসা করে ভাষার বারোটা বাজাতে নির্বিকার পাঠকের দায়ও কম নয়।

মায়ের মুখের প্রিয় ভাষার যত্ন এবং রক্ষণাবেক্ষণে লেখক, পাঠক সবারই কিছু দায় তো থেকেই যায়।

বেলমন্ট, ম্যাসাচুসেটস
ফেব্রুয়ারি ১, ২০২২
মাঘ ১৮, ১৪২৮

শেয়ার করুন...




©All rights reserved Magura Protidin. 2018-2022
IT & Technical Support : BS Technology