আজ, শনিবার | ১৮ই মে, ২০২৪ খ্রিস্টাব্দ | রাত ১১:১২

ব্রেকিং নিউজ :

স্মৃতির আয়নায় প্রিয় শিক্ষক কাজী ফয়জুর রহমান

আসমা সিদ্দিকা মিলি : আমার প্রিয় শিক্ষক, প্রিয় অভিভাবক কাজী ফয়জুর রহমান। মাগুরা জেলার শ্রীপুর থানার হাট দ্বারিয়াপুর সম্মিলনী মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠাতা প্রধান শিক্ষক হিসেবে যিনি দীর্ঘ দিন কর্মরত ছিলেন। অতঃপর এই স্কুল থেকেই তিনি অবসর নিয়েছিলেন। ১৫ এপ্রিল তিনি জীবন থেকেও অবসরে চলে গেলেন চিরদিনের জন্য। সকাল ১১ টায় স্যার মৃত্যুবরণ করেন (ইন্না-লিল্লাহী… …রাজিউন)। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল ৯৪ বছর।

স্যার শুধু একজন প্রধান শিক্ষক ছিলেন না, তিনি নিজেই একটি প্রতিষ্ঠান ছিলেন। তাঁর শ্রম, সাধনা এবং স্বপ্ন মিলিয়ে হাট দ্বারিয়াপুর সম্মিলনী মাধ্যমিক বিদ্যালয় খুলনা বিভাগে শ্রেষ্ঠ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের স্বীকৃতি পেয়েছিল। তিনি পেয়েছিলেন শ্রেষ্ঠ শিক্ষকের মর্যাদা। যদিও এ স্বীকৃতি তাঁর সামগ্রিক কর্মের কাছে আমার মনে হয় খুবই নগণ্য। স্যারের আধুনিক চিন্তাধারা, আভিজাত্য, যুগোপযোগী কর্ম পরিকল্পনা,  শিক্ষার্থীদের প্রতি দায়িত্ববোধ, ভালবাসা স্নেহ মমতা, আচার ব্যবহার, মানবিকবোধ, সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় সকল দায়িত্ব ও আচার পালনে আন্তরিকতা-সর্বোপরি কঠোর শঙ্খলাবোধ আমাদের মধ্যে যে চেতনার জন্ম দিয়েছিল তা আমাদের আজও মানুষ করে রেখেছে।

আমরা মিথ্যাচার শিখিনি। চাটুকারিতা, হটকারিতা ঘৃণা করি। আল্লাহ ছাড়া কারো কাছে মাথা নোয়ানো শিখিনি। আমাদের প্রতিবাদের ভাষা শালীন। আমরা ভদ্রতাবোধকে লালন করি, মানবিকতার চর্চা করি, সংস্কৃতিকে ধারণ করি, কর্তব্য পালন করি, শালীনতা বজায় চলি, আধুনিকতা ধারণ করি, কুটিলতা পরিহার করি। স্যারের শিক্ষায় এক অনন্য জীবন দর্শন তৈরি করে আমরা জাগতিক জীবনে এগিয়ে চলেছি।

আমি বলব, প্রত্যেকটা বিষয় তিনি আমাকে শিখিয়েছেন। তিনি আমাকে হাঁটতে শিখিয়েছেন, কথা বলতে শিখিয়েছেন, লিখতে শিখিয়েছেন, ভাবতে শিখিয়েছেন, স্বপ্ন দেখতে শিখিয়েছেন, জীবনের অর্থ বুঝিয়েছেন, আত্মনির্ভরতা বুঝিয়েছেন, আমার মাঝে আত্মসম্মান বোধের জন্ম দিয়েছেন। আত্মঅহমিকাও শিখিয়েছেন। আত্মঅহামিকা না থাকলে আত্মসম্মান বোধ মজবুত থাকে না।

তিনিই আমাকে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর কে চিনিয়েছেন। লাবণ্য কেতকীর তফাৎ বুঝতে সাহায্য করেছেন। তাঁর পূন্যধামে কত পূর্ণার্থী জীবনে আলোর পথের সন্ধান পেয়েছে কত শত হাজার জন, সে হিসেব আমার জানা না থাকলেও সে তালিকায় আসমা আর আয়েশা নাম দুটি লিখা আছে এতোটুকু ভালো করে জানি। তিনি আমাকে  ‘আসমা’ নামেই ডাকতেন। আমার বোন শেলীকে ডাকতেন ‘আয়েশা’নামে ।

তখন আমি মাস্টার্স শেষ বর্ষে অধ্যয়নরত। উনার সাথে সাক্ষাৎ করতে একবার স্কুলে গিয়েছিলাম। সেদিন কথা প্রসঙ্গে বলেছিলেন,  ‘আসমা আমার শিক্ষকতা জীবনের কিছু প্রিয় ছাত্রছাত্রীর মধ্যে তুমিও একজন। দেখো তোমার ক্লাস নাইনে নাম রেজিস্ট্রশনে দেওয়া সাদা কালো একটি ছবি অফিসের ছবির বোর্ডে আজও রেখে দিয়েছি। তোমার পহেলা বৈশাখ অনুষ্ঠানের ধারা বিবরণী রেকর্ড আজও শুনি আমি।’এসব শুনে সেদিন মনে হয়েছিল এতো স্নেহ আমি কোথায় পাবো! মুহূর্তে চোখ ভিজে আসছিল। হয়তো বুঝতে পেরেই প্রসঙ্গ বদলে দিয়ে বললেন, প্রজ্ঞা লাবনীকে বলে দিবো তোমাকে আবৃত্তি শেখাতে। স্যার, ভীষণ ভালোবাসতেন রবীন্দ্রনাথের কবিতা আবৃত্তি। কিন্ত আমার শেখা হয় নি। তারজন্য আজও আমার আফসোস হয়। তিনি রবীন্দ্রনাথের সাহসী নারী চরিত্রের মাঝে নিজেকে খুঁজে নিতে বলেছিলেন।

আমাদের স্কুলে সাধারণ শিক্ষা কারিকুলামের পাশাপাশি কিছু অতিরিক্ত বিষয় শেখানো হতো। তাতে মার্কস দেওয়া হতো, ফাইনাল পরীক্ষায় নম্বর যোগ হতো। যেমন দ্রুত পঠন লিখন, কায়িকশ্রম, সাধারণ জ্ঞান। সারাবছর আমাদের সকাল ৭ টার রেডিও খবর শুনতে হতো। স্কুলে একটি নিউজ বোর্ড ছিল সেখানে কয়েকজনকে প্রতিদিন দেশ বিদেশের গুরুত্বপূর্ণ নিউজ চক দিয়ে লিখতে হতো। টিফিনে সবাই একবার তা পড়ে আসতো। এগুলো নোট করতে হতো, নয়তো মনে রাখতে হতো। পরবর্তীতে এগুলো সাধারণ জ্ঞান পরীক্ষায় কাজে দিতো। কি সূদুরপ্রসারী চিন্তা ছিল স্যারের তাঁর শিক্ষার্থীদের জন্য।

ছোট্ট একটা লাইব্রেরি ছিল স্কুলে। প্রতি সপ্তাহে একটা বই নিতে হতো পড়ার জন্য। শুধু তাই নয় পরের সপ্তাহে বুক রিভিউ দিতে হতো। ফাঁকি দেবার সুযোগ নেই। নিজের স্কুল ইউনিফর্ম নিজেকে ধুতে হতো, ইস্ত্রি করতে হতো। তিনি জানতে চাইতেন আমরা কাজটা করেছি কি না। স্যারের শান্ত স্হির চোখের দিকে তাকিয়ে কারোর মিথ্যা বলার সাহস ছিল না।

মাস শেষে মূল্যায়ন মিটিং হতো। কার ইউনিফরম সমস্যা, কে কিভাবে হাঁটে, কথা বলে, কোন ছেলের চুল কাটা ঠিক ছিল না। কোন মেয়ের চুল বাঁধা সঠিক হয়নি, কে বৃষ্টিতে ছাতা ব্যবহার করেনি। বৃষ্টি কাঁদায় মাখামাখি করে কে স্কুলে এসেছে, কে সরাসরি স্কুল থেকে বাসায় না গিয়ে অন্য কোথাও গিয়েছে (এ ক্ষেত্রে বেতের বাড়ি কনফার্ম ছিল);  সব খবর ওনার কাছে ছিল। সেগুলো বের করে ট্রিটমেন্টও দিতেন ভালো মত।

ফ্রিজিং ভ্যানে স্যারের চিরনিদ্রায় শায়িত সুন্দর, সৌম, শান্ত মুখ খানা দেখে মনে হলো কি নিষ্পাপ, নির্মল চেহারাখানি আধো খোলা ঠোঁটে যেনো স্যার বলছেন, “রেখে গেলাম তোমাদের, দায়িত্বে এতোটুকু অবহেলা করো না। এ সমাজ তোমাদের, এ মানুষ গুলো তোমাদের, তাদের ভালোর জন্য কাজ করো। তোমরা ভালো মানুষ হও।”

স্যার, অত্যধিক ধার্মিক ছিলেন। কোরানের অর্থ তর্জমা করেছেন। আল্লাহর ধ্যান করেছেন। জ্ঞানপিপাসু মানুষটি জীবন সায়াহ্নেও জ্ঞানচর্চায় ব্যস্ত থাকতেন। সবাই স্যারের জন্য দোয়া করবেন। আমরা একজন গুরুত্বপূর্ণ অভিভাবক হারিয়েছি। যার বিকল্প বর্তমান সময়ে নেই। দোয়া করি মহান আল্লাহ স্যারকে জান্নাতুল ফেরদৌসের মেহমান করুন। স্যারের কথা তো একদিনে লিখে শেষ হবে না। আবার লিখবো।

আসমা সিদ্দিকা মিলি, বিপিএম, পিপিএম
উপ-পুলিশ কমিশনার, ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ, ঢাকা।

শেয়ার করুন...




©All rights reserved Magura Protidin. 2018-2022
IT & Technical Support : BS Technology