আজ, মঙ্গলবার | ১৪ই জুলাই, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | রাত ১০:৪৮

ব্রেকিং নিউজ :
শরীয়তপুরের বুকে এক টুকরো ইতিহাস: ছায়াঘেরা ‘ছয়গাঁও সিকদার বাড়ি’র খোঁজে শালিখায় ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর মাঝে শিক্ষাবৃত্তি, বাইসাইকেল ও সেলাই মেশিন বিতরণ শ্রীপুরে বিশ্ব জনসংখ্যা দিবসে সম্মাননা পেলেন শ্রেষ্ঠরা সরকারি কর্মকর্তাকে হুমকি দেওয়ায় শালিখা যুবদল নেতা নয়ন মুন্সী বহিস্কার জাদুশিল্প পেল রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি, সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের অন্তর্ভুক্তির ঘোষণা যুগ্ম সচিব পদে পদোন্নতি পেলেন মাগুরা জেলা প্রশাসক মোতাকাব্বীর আহমেদ এইচএসসিতে মাগুরায় ২৫০ শিক্ষার্থী অনুপস্থিত মাগুরার শ্রীপুরে তিন মাদ্রাসা ছাত্র নিখোঁজ, উদ্বেগে পরিবার পুলিশের ৩৩ শীর্ষ কর্মকর্তা বাধ্যতামূলক অবসরে, তালিকায় মাগুরার এক কর্মকর্তা ডিমেনশিয়ায় আক্রান্ত শিল্পী শবনম মুস্তারীকে দেখতে গেলেন মন্ত্রী নিতাই রায় চৌধুরী

শরীয়তপুরের বুকে এক টুকরো ইতিহাস: ছায়াঘেরা ‘ছয়গাঁও সিকদার বাড়ি’র খোঁজে

সঞ্জয় কুমার দত্ত : শহুরে ব্যস্ততা যখন দমবন্ধকর ঠেকে, তখন প্রাচীন কোনো স্থাপত্যের নীরবতাই পারে মনের ক্লান্তি দূর করতে। এমনই এক ছুটির সকালে ব্যাগ পিঠে চেপে রওনা হয়েছিলাম শরীয়তপুরের উদ্দেশ্যে। লক্ষ্য—ভেদরগঞ্জ উপজেলার ছয়গাঁও ইউনিয়নের বাংলা বাজার গ্রাম। সেখানে নাকি কালের সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে এক রাজকীয় কীর্তি, স্থানীয়দের কাছে যা পরিচিত “ছয়গাঁও সিকদার বাড়ি” বা ছয়গাঁও জমিদার বাড়ি নামে।

মখমলি সবুজ পেরিয়ে এক রাজকীয় প্রবেশ
পিচঢালা সরু পথ ধরে যখন আমাদের গাড়িটি এগোচ্ছিল, দুপাশে চোখ জুড়ানো মখমলের মতো সবুজ ঘাসের বিস্তীর্ণ মাঠ যেন স্বাগত জানাচ্ছিল। মাঠের শেষ প্রান্তে শান্ত এক দীঘি, যার চারপাশ ঘিরে রেখেছে নারিকেল আর সুপারি গাছের সারি। ঠিক সেই শান্ত স্নিগ্ধ গ্রামীণ পরিবেশের বুক চিরে হঠাৎ করেই চোখের সামনে ভেসে উঠল এক লালচে রঙের দোতলা প্রাসাদ। প্রথম দর্শনেই এর ইন্দো-সারাসেনিক বা ঔপনিবেশিক স্থাপত্যশৈলী চোখ ধাঁধিয়ে দেয়!

নিচতলার প্রবেশদ্বারে পা রাখতেই চোখে পড়ল মার্বেল পাথরের রাজকীয় সিঁড়ি। সবুজ রঙের কাঠের জানালার খড়খড়িগুলো যেন এখনো পুরনো দিনের বাতাস হাতড়ে বেড়াচ্ছে। ভবনের ছাদের কার্নিশে ছোট ছোট গম্বুজাকৃতির মিনার আর চমৎকার প্যারাপেট দেওয়াল পুরো বাড়িটিতে এনে দিয়েছে এক আভিজাত্যের ছোঁয়া।

দেওয়ালে খোদাই করা এক অমর ভালোবাসার উপাখ্যান
ভবনের ভেতরে ঢোকার মুখেই দেওয়ালে চোখ আটকে গেল। লাল রঙের চতুষ্কোণ ফ্রেমে বাঁধানো একটি ঐতিহাসিক শ্বেতপাথরের স্মৃতিফলক। একটু কাছে গিয়ে ইংরেজিতে খোদাই করা লেখাগুলো পড়তেই মনটা এক অদ্ভুত বিষাদে ভরে উঠল:

> “THIS BUILDING WAS BUILT IN 1934 to PERPETUATE THE MEMORY OF Sayfurennesa Begum, WHO DIED IN CALCUTTA ON FRIDAY THE 6TH JANUARY 1933 AND WAS BURIED AT GOBRA. BY HER BEREAVED HUSBAND H. M. KHALILUR RAHMAN.”

>ইতিহাস ঘেঁটে জানা গেল, ১৯৩৩ সালের জানুয়ারি মাসে কলকাতায় প্রিয়তমা স্ত্রী সাইফুরেন্নেসা বেগমের মৃত্যুর পর, শোকার্ত স্বামী খান বাহাদুর খলিলুর রহমান সিকদার (খান বাহাদুর খোকা সিকদার) তাঁর স্মৃতির উদ্দেশ্যে ১৯৩৪ সালে এই নান্দনিক ভবনটি নির্মাণ করেন। তাজমহলের মতো না হলেও, শরীয়তপুরের এই কোণেও যে একটা ভালোবাসার অমর কাব্য লুকিয়ে আছে, তা না এলে জানাই হতো না।

যেখানে মিশে আছে ব্রিটিশ ক্যাম্প আর বীর মুক্তিযোদ্ধাদের পদচিহ্ন
বাড়িটির বারান্দায় দাঁড়িয়ে যখন চারপাশ দেখছিলাম, ভাবছিলাম এর ঐতিহাসিক গুরুত্বের কথা। এটি কেবল কোনো সাধারণ বাসস্থান ছিল না, ছিল ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের এক অগ্নিগর্ভ কেন্দ্র। ১৯৩০ থেকে ১৯৩৪ সাল পর্যন্ত এই বাড়িটি দখল করে ব্রিটিশ সরকার একটি শক্ত সেনাঘাঁটি (ব্রিটিশ ক্যাম্প) স্থাপন করেছিল, যাতে বিপ্লবীদের দমন করা যায়। মোতায়েন করা হয়েছিল বহু শিখ সেনা।

শুধু তাই নয়, ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে এই বাড়িটি ধারণ করে এক গৌরবোজ্জ্বল ভূমিকা। বীর মুক্তিযোদ্ধাদের অন্যতম প্রধান প্রশিক্ষণ ক্যাম্প ছিল এটি। স্থানীয়দের মুখে শুনলাম, তৎকালীন সময়ে সেনাসদস্য ও স্থানীয়দের সহায়তায় প্রতিদিন প্রায় ১০০ জন অবরুদ্ধ তরুণকে এখানে যুদ্ধবিদ্যা ও অস্ত্রের নিবিড় প্রশিক্ষণ দেওয়া হতো। ভাবতেই গা শিউরে উঠছিল, এই প্রাঙ্গণেই একদিন স্বাধীনতার জয়ধ্বনি উঠেছিল!

ভেতরের জাদুকরী কারুকাজ ও কাঠের বাংলো
ভেতরে প্রবেশ করতেই দেখা মিলল এক অনবদ্য সিঁড়ি ঘরের। লাল টাইলস আর ইটের তৈরি সিঁড়ির রেলিংয়ে গাঢ় সবুজ কাঠের হাতল। তবে সবচেয়ে বেশি মুগ্ধ করেছে সিঁড়ির পাশের দেওয়ালের জ্যামিতিক নকশার প্রাচীন মোজাইক টাইলসগুলো, যেখানে নিখুঁতভাবে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে গোলাপী ফুল ও পাতার মোটিফ।

মূল প্রাসাদ থেকে কিছুটা দূরে চোখ গেল প্রাঙ্গণে থাকা একটি ঐতিহ্যবাহী উঁচু কাঠের ও টিনের ঘরের দিকে। লালচে কাঠের প্যানেল আর ওপরে জং ধরা টিনের চালা—এটি যেন খাঁটি গ্রামীণ আভিজাত্যের এক অনন্য প্রতীক। চারপাশে ঘন জঙ্গল আর গাছপালার মাঝে ঘরটি এক রহস্যময় পরিবেশ তৈরি করে রেখেছে।

এক নিঃসর্থ রূপকারের গল্প
বর্তমানে এই বাড়িটিকে ঘিরেই গড়ে উঠেছে “ছয়গাঁও বাংলা বাজার” জনপদ। তবে সবচেয়ে অবাক করা এবং প্রশংসনীয় বিষয় হলো, কোনো সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা ছাড়াই সম্পূর্ণ ব্যক্তিগত অর্থায়নে এই বিশাল ঐতিহাসিক ভবনটি অত্যন্ত পরিপাটি ও পরিষ্কার করে রাখা হয়েছে। আর এই পুরো দেখভালের দায়িত্বটি নিজের মনের টানে আপন মনে করে যাচ্ছেন সৌন্দর্যপ্রেমী সাবেদুর রহমান খোকা সিকদার। ওনার এই নিঃসার্থ প্রচেষ্টা সত্যিই স্যালুট পাওয়ার যোগ্য!

বিকেলের মৃদু বাতাসে দোতলার বারান্দায় দাঁড়িয়ে যখন চারপাশের শান্ত গ্রামীণ পরিবেশ দেখছিলাম, মনে হচ্ছিল ইতিহাস, রাজনীতি, যুদ্ধ আর নিখাদ ভালোবাসার এমন অপূর্ব মেলবন্ধন খুব কম জায়গাতেই আছে।

ছুটির দিনে যান্ত্রিক জীবন থেকে দূরে কোথাও হারাতে চাইলে, পরিবার বা বন্ধুদের নিয়ে ঘুরে আসতেই পারেন শরীয়তপুরের এই গর্বের স্মারক থেকে।  ইতিহাস আর প্রকৃতির এই যুগলবন্দী আপনার মন ভালো করে দেবেই!
ভ্রমণ কাহিনী লেখক: পরিব্রাজক ও ব্যাংকার

শেয়ার করুন...




©All rights reserved Magura Protidin. 2018-2022
IT & Technical Support : BS Technology