সঞ্জয় কুমার দত্ত : তখন ১৯০৫ সাল। পুরো বাংলা জুড়ে উত্তাল হাওয়া। বঙ্গভঙ্গের এক নতুন উদ্দীপনায় কাঁপছে এই জনপদ। সেই রাজনৈতিক আর সামাজিক পরিবর্তনের ঢেউ এসে আছড়ে পড়ল শরীয়তপুর সদর উপজেলার রুদ্রকর ইউনিয়নের চন্দনকর মৌজার ছোট্ট এক গ্রাম বুড়িরহাটে।
তখনকার বুড়িরহাট এলাকাটি ছিল মূলত হিন্দু-অধ্যুষিত। সেখানে বসবাসকারী মুষ্টিমেয় মুসলিমদের জন্য আল্লাহকে সেজদা করার মতো নির্দিষ্ট কোনো ঘর ছিল না। গ্রামের এক ধনাঢ্য ও ধর্মানুরাগী ব্যবসায়ী, নাম তাঁর *একাব্বর হোসেন হাওলাদার*। বুকে তাঁর ইমানের আলো, আর চোখে এক সুন্দর স্বপ্ন। তীব্র রোদ কিংবা বর্ষায় তিনি একটি গাছের নিচে দাঁড়িয়ে একা একা ইবাদত করতেন। তাঁর মনে ব্যাকুলতা—এভাবে আর কতদিন?
অবশেষে ১৯০৭ সালের এক সকালে, একাব্বর হোসেন হাওলাদার গ্রামের বিশিষ্ট ব্যক্তিদের এক করলেন। সবার চোখে তখন বঙ্গভঙ্গের নতুন আত্মনিয়ন্ত্রণের প্রেরণা। সেই প্রেরণা থেকেই মুন্সী ও হাওলাদার পরিবারের যৌথ উদ্যোগে, ছন আর গোলপাতা দিয়ে পরম মমতায় খাড়া করা হলো ছোট্ট একটা ঘর। জন্ম নিল আজকের এই ঐতিহাসিক *”বুড়িরহাট জামে মসজিদ”*। শুরু হলো নামাজ আর ছোট্ট শিশুদের কোরআন শিক্ষার এক পবিত্র যাত্রা।
ছন-পাতা থেকে ইট-পাথরের রাজকীয় রূপ
দিন বদলাতে লাগল। ছন আর গোলপাতার সেই ঘরটি কালের নিয়মে ক্ষয়ে যেতে থাকলে, ১৯১০ সালের দিকে একাব্বর হোসেনের যোগ্য ছেলে মমতাজ উদ্দিন হাওলাদার মসজিদটিকে একটি সুন্দর টিনের ঘরে রূপান্তর করেন। কিন্তু গ্রামের মানুষের স্বপ্ন তো আরও বড়!
১৯৩৫ সালের দিকে মমতাজ উদ্দিন হাওলাদার, মন্তাজ উদ্দিন মুন্সী এবং প্রকৌশলী আফতাব উদ্দিন মুন্সী মিলে এক ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত নিলেন—মসজিদটিকে তারা পাকা করবেন। প্রকৌশলী আফতাব উদ্দিন মুন্সী মনের মাধুরী মিশিয়ে কলকাতার বিখ্যাত টিপু সুলতান মসজিদের আদলে এর এক অপূর্ব নকশা তৈরি করলেন।
যেই ভাবা সেই কাজ! কিন্তু সেই যুগে প্রত্যন্ত এই গ্রামে আধুনিক উপাদান কোথায়? কোনো আপস করলেন না তারা। নদীপথে সরাসরি *ইংল্যান্ড থেকে আনা হলো বিশেষ সিমেন্ট*, আর কলকাতা থেকে কিনে পাঠানো হলো নিখুঁত পাথর ও অন্যান্য নির্মাণ সামগ্রী। চুন, সুড়কি আর সাদা সিমেন্টের মিশ্রণে কারিগররা দিনরাত এক করে গড়ে তুললেন একতলা এক রাজকীয় ভবন। ভেতরের দেওয়ালে মার্বেল পাথর আর রঙিন সিরামিক চূর্ণ ভেঙে ভেঙে চাঁদপুরের দক্ষ কারিগররা এঁকে দিলেন লতাপাতার চোখ জুড়ানো নকশা। দেয়ালগুলো করা হলো ৩ ফুটেরও বেশি পুরু, যেন শত ঝড়-তুফানেও আল্লাহর এই ঘরটি অটল থাকে।
১৯৭৮ সালের সেই স্মরণীয় দুপুর: রাষ্ট্রনায়কের আগমন
দিনটি ছিল ১৯৭৮ সালের এক সাধারণ দিন। বুড়িরহাটের মানুষ তখনও ভাবেনি আজ তাদের গ্রামে এক অনন্য ইতিহাস তৈরি হতে যাচ্ছে।
তৎকালীন বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি, বীর মুক্তিযোদ্ধা *শহীদ জিয়াউর রহমান* রাষ্ট্রীয় সফরে শরীয়তপুরের ভেদরগঞ্জ উপজেলার একটি জনসভার উদ্দেশ্যে রওয়ানা হয়েছেন। তাঁর বিশাল গাড়িবহর ধুলো উড়িয়ে এগিয়ে চলেছে প্রত্যন্ত গ্রামীণ পথ ধরে। হঠাৎ বুড়িরহাট পার হওয়ার সময় রাষ্ট্রপতির চোখ আটকে গেল রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে থাকা এক অপরূপ স্থাপত্যের দিকে। প্রত্যন্ত এই অজপাড়াগাঁয়ে এমন রাজকীয় কারুকার্যময় মসজিদ?
প্রেসিডেন্ট জিয়া তাঁর গাড়িবহর থামানোর নির্দেশ দিলেন। নিরাপত্তারক্ষীদের চমকে দিয়ে তিনি গাড়ি থেকে নেমে সোজা হেঁটে চললেন মসজিদের দিকে। সেখানে যাত্রাবিরতি করে তিনি পরম ভক্তিভরে মহান আল্লাহর দরবারে সালাত আদায় করলেন। নামাজ শেষে তিনি অপলক চোখে চুন-সুড়কি আর রঙিন সিরামিক কুচির সেই চোখ ধাঁধানো কারুকার্য দেখলেন। একজন রাষ্ট্রপ্রধান এমন প্রত্যন্ত অঞ্চলে দিল্লির টিপু সুলতান মসজিদের এই ছোঁয়া দেখে রীতিমতো বিস্ময়াভিভূত ও মুগ্ধ হলেন।
তিনি কেবল নামাজ পড়েই চলে যাননি; এই প্রাচীন ইসলামী ঐতিহ্যের টেকসই সুরক্ষার গুরুত্ব তিনি বুঝতে পেরেছিলেন। যাওয়ার আগে তিনি তাঁর সফরসঙ্গী, প্রশাসনের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা এবং স্থানীয় নেতৃবৃন্দকে কড়া নির্দেশ দিয়ে গেলেন—”এই প্রাচীন সৌন্দর্য যেন কোনোভাবেই নষ্ট না হয়। এর আদি রূপ ধরে রেখে যেন অবকাঠামোগত উন্নয়ন করা হয় এবং মসজিদ কমিটির নিয়মিত খোঁজখবর রাখা হয়।” রাষ্ট্রনায়ক জিয়ার সেই আকস্মিক আগমন আর প্রশংসা বুড়িরহাটের মানুষের বুক গর্বে ভরিয়ে দিয়েছিল, যা আজও এলাকার মুরুব্বিরা গল্প আকারে নতুন প্রজন্মের কাছে শোনান।
সময়ের সাথে আধুনিকতার ছোঁয়া
নব্বইয়ের দশকে এসে মসজিদের সৌন্দর্য আরও বাড়িয়ে তুলতে মূল ফটকের পাশে একটি সুউচ্চ মিনার নির্মাণের সিদ্ধান্ত হয়। ১০ জন দক্ষ মিস্ত্রি টানা দেড় বছর দিনরাত পরিশ্রম করে তৈরি করলেন ৬০ ফুটের এক দৃষ্টিনন্দন মিনার।
কালক্রমে যখন মুসল্লিদের সংখ্যা অনেক বেড়ে গেল, তখন ২০১৫ সালে নেওয়া হলো এক বিশাল সম্প্রসারণ প্রকল্প। তবে একটা শর্ত ছিল—আদি ইতিহাসকে ছোঁয়া যাবে না। কারিগররা আদি ৩ ফুটের দেয়াল ও মূল নকশা সম্পূর্ণ অক্ষুণ্ণ রেখে উত্তর ও পূর্ব পাশে মসজিদটিকে বড় আকারে সম্প্রসারণ করলেন। আগে যেখানে গম্বুজ ছিল ১০টি, মোঘল স্থাপত্যের আদলে বর্তমান গম্বুজের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৩০টি (৬টি বড় এবং ২৪টি ছোট)। আয়তাকার মসজিদটি রূপ নিয়েছে এক বিশাল বর্গাকৃতির সুন্দর দুর্গে, যেখানে এখন একসঙ্গে ১,০০০ জনেরও বেশি মানুষ নামাজ পড়তে পারেন।
১১৯ বছরের সৌহার্দ্যের বন্ধন
এই মসজিদের শুধু দেয়ালগুলোই প্রাচীন নয়, এর ভেতরের মানুষের মনটাও এক অনন্য ঐতিহ্যে বাঁধা। প্রতিষ্ঠার পর থেকে আজ পর্যন্ত দীর্ঘ ১১৯ বছর ধরে প্রতি রমজান মাসে এখানে একটি সুন্দর নিয়ম মেনে চলা হয়।
দিনশেষে যখন মাগরিবের আজান ঘনিয়ে আসে, মসজিদের বিশাল আঙিনায় এসে বসেন এলাকার দিনমজুর, রিকশাচালক, পথচারী থেকে শুরু করে সাধারণ রোজাদারেরা। প্রতিদিন প্রায় ৪০০ থেকে ৫০০ মানুষের জন্য এখানে ঐতিহ্যবাহী ইফতারের আয়োজন করা হয়। ধনী-দরিদ্রের কোনো ভেদ থাকে না, সবাই এক কাতারে বসে সৌহার্দ্যের সাথে ইফতার করেন।
আজও শরীয়তপুর-চাঁদপুর সড়ক দিয়ে যাওয়ার সময় বুড়িরহাটের দক্ষিণ-পশ্চিম প্রান্তে তাকালে চোখে পড়ে এক শান্ত স্নিগ্ধ পরিবেশ। পাশে বাঁধানো ঘাটের সুন্দর পুকুর, পশ্চিমে মসজিদ মার্কেট, নিজস্ব ঈদগাহ আর ৬০ ফুটের ই মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে থাকা মিনার।
বুড়িরহাট জামে মসজিদ কেবল চুন-সুড়কির কোনো দালান নয়; এটি আমাদের পূর্বপুরুষদের গভীর ইমান, শিল্পমনস্কতা এবং বাংলাদেশের ইতিহাসের এক জীবন্ত ও জ্বলজ্বলে সাক্ষী। শরীয়তপুরের বুকে এ যেন এক টুকরো জান্নাতি প্রশান্তি।
লেখক- ব্যাংকার, পরিব্রাজক