মাগুরা প্রতিদিন : মৃত্যুর সঙ্গে নিরন্তর লড়াই করে পরাজিত হওয়ার আশঙ্কায় মৃত্যুর আগে পরিবারকে স্কুল শিক্ষার্থীটি ভিডিওর মাধ্যমে জানিয়ে গেলেন কীভাবে তারই ঘনিষ্ট বন্ধু ও তার সহযোগিরা নির্মম নির্যাতন চালিয়েছে।
পরিচিতদের হাতে দলবদ্ধ ধর্ষণের শিকার হওয়ার পর লোকলজ্জা আর অসহনীয় মানসিক যন্ত্রণায় তিনবার আত্মহত্যার চেষ্টা করে সে। মৃত্যুর দুদিন আগে বড় বোনের কাছে ধারণ করা ভিডিওতে নির্যাতনের বর্ণনা দিয়ে অভিযুক্তদের বিচার চেয়েছিল কিশোরীটি। কিন্তু সেই বিচার আর দেখে যেতে পারেনি সে।
হারপিক পান করে অসুস্থ্ মিলি ২৬ অক্টোবর নিজ বাড়িতে মৃত্যুবরণ করে। পরিবারের অভিযোগ, মৃত্যুর পর ধর্ষণের ঘটনায় মামলা করতে গিয়েও পুলিশের সহযোগিতা পাননি পরিবার। বরং অভিযুক্তদের আড়াল করতে ঘটনাটি ভিন্ন খাতে নেওয়ার চেষ্টা চলছে।
পরিবারের অভিযোগ, ধর্ষণের ঘটনায় নির্দিষ্ট ব্যক্তিদের নাম উল্লেখ করে মামলা করতে গেলেও পুলিশ তা নেয়নি। উল্টো পুলিশ হেফাজতে থাকা অবস্থায় হারপিক পানের অভিযোগ আড়াল করে ঘটনাটিকে ভিন্ন খাতে নেওয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে। এমনকি মেয়েটি তার মামা মোহাম্মদ আলীর বাড়িতে হারপিক পান করেছিল-এমন বক্তব্য তৈরি করে তার বাবার স্বাক্ষর নেওয়া হয়েছে বলেও অভিযোগ পরিবারের। তাদের দাবি, শ্রীপুর থানা ও নাকোল পুলিশ ফাঁড়ির সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা স্থানীয় একটি চিহ্নিত কিশোর গ্যাংয়ের সদস্যদের দায়মুক্তি দিতে এসব ফন্দিফিকির করছেন।
গণ ধর্ষণের শিকার মেয়েটি ফরিদপুরের মধুখালী উপজেলার কাজী সিরাজুল ইসলাম স্কুল অ্যান্ড কলেজের নবম শ্রেণির শিক্ষার্থী। তার বাবা হান্নান খান একজন দরিদ্র কৃষক। তাঁদের বাড়ি মাগুরার সীমান্তবর্তী রাজধরপুর গ্রামে।
পরিবার ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, গত ১৪ সেপ্টেম্বর সকাল সাড়ে ৯টার দিকে স্কুলে যাওয়ার উদ্দেশ্যে বাড়ি থেকে বের হয় মেয়েটি। বিশ্বরোড এলাকায় পৌঁছালে তার পরিচিত বন্ধু মাগুরার শ্রীপুর উপজেলার নাকোল গ্রামের রাফি দুই বন্ধুকে নিয়ে মোটরসাইকেলে সেখানে আসে। রাফি তাকে নিজের মোটরসাইকেলে তুলে অন্য দুই বন্ধুর সঙ্গে ডুমাইন ঘাটে যায়। সেখান থেকে নৌকায় গড়াই নদী পার হয়ে তারা মাগুরার শ্রীপুর উপজেলার মাটিকাটা ঘাটে পৌঁছায়।
অভিযোগ অনুযায়ী, নদীর পাড়ে নিয়ে রাফি, রাহুল ও সায়েম মিলে মেয়েটিকে ধর্ষণ করে। পরে তাদের কাছ থেকে পালিয়ে ঘাটে গিয়ে নদীতে ঝাঁপ দেয় কিশোরীটি। এ সময় নৌকার মাঝি তাকে উদ্ধার করে পুলিশকে খবর দেন। পরে নাকোল পুলিশ ফাঁড়ির সদস্যরা তাকে উদ্ধার করে ফাঁড়িতে নিয়ে যান।
পরিবারের দাবি, ফাঁড়িতে নেওয়ার পর সকাল সাড়ে ১০টার দিকে বাথরুমে ঢুকে হারপিক পান করে মেয়েটি। গুরুতর অসুস্থ অবস্থায় প্রথমে তাকে মাগুরা ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট হাসপাতালে, পরে ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। দীর্ঘদিন চিকিৎসাধীন থাকার পর চিকিৎসকেরা তাকে বাঁচানো সম্ভব নয় বলে পরিবারকে জানান। গত ২০ অক্টোবর বাড়িতে ফিরিয়ে আনার পর নিজের শারীরিক অবস্থার অবনতির কথা বুঝতে পেরে বড় বোন সীমার কাছে নির্যাতনের ঘটনা খুলে বলে সে।
বড় বোন সীমা খাতুন বলেন, “বোন ধর্ষণের শিকার হয়েছিল, তা আগে জানতে পারিনি। চিকিৎসকেরা যখন জানান, তাকে আর বাঁচানো সম্ভব নয়, তখন বাড়িতে আনার পর বোন আমাদের সবকিছু জানায়। একটি ভিডিওতে সে রাফি, রাহুল ও সায়েম নামে তিনজনের বিরুদ্ধে ধর্ষণের অভিযোগ করেছে। এ ছাড়া মামাতো ভাই সোহাগের সম্পৃক্ততার কথাও জানিয়ে সে ওই ভিডিওতে অভিযুক্তদের শাস্তি দাবি করে।”
সীমার অভিযোগ, মামাতো ভাই সোহাগ মেয়েটিকে বিয়ে করতে চেয়েছিল। পরিবার রাজি না হওয়ায় সে বন্ধুদের দিয়ে তাকে তুলে নিয়ে ধর্ষণ করিয়েছে।
নদী থেকে উদ্ধারের পর মেয়েটিকে নাকোল পুলিশ ফাঁড়িতে নেওয়া হয়েছিল বলে ফাঁড়ির ইনচার্জ আবদুল মালেক স্বীকার করেছেন। তবে ফাঁড়িতে হারপিক পানের অভিযোগ অস্বীকার করে তিনি বলেন, “সকাল ১০টা ৪০ মিনিটের দিকে মেয়েটি ফাঁড়ি থেকে চলে যাওয়ার পর তার মামার বাড়িতে গিয়ে হারপিক পান করে অসুস্থ হওয়ার খবর পেয়েছি।”
তবে মেয়েটির মামা মোহাম্মদ আলী বলেন, “নদী থেকে উদ্ধারের পর তাকে নাকোল ফাঁড়িতে নেওয়া হয়। সেখানে বাথরুমে ঢুকে সে হারপিক পান করে। পুলিশ অসৎ উদ্দেশ্যে মামলায় আমার বাড়ির কথা লিখেছে।”
মেয়েটির বড় বোনের স্বামী বিপ্লব শেখের অভিযোগ, মৃত্যুর দিন দুপুর ১টার দিকে নির্দিষ্ট আসামিদের নাম উল্লেখ করে থানায় মামলা করতে গেলে শ্রীপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা তাঁদের দীর্ঘ সময় এলোমেলো বুঝিয়ে মামলা নেননি। পরে নিজেদের ইচ্ছামতো বক্তব্য লিখে তাঁর শ্বশুরকে দিয়ে স্বাক্ষর করিয়ে নেওয়া হয়।
এ বিষয়ে শ্রীপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা ওলি মিয়া বলেন, “হারপিক পান করে অসুস্থ হওয়ার পর মেয়েটির মৃত্যু হয়েছে। মধুখালী থানা পুলিশের পক্ষ থেকে এমন একটি বার্তা পাওয়া যায়। যার প্রেক্ষিতে প্রাথমিকভাবে একটি অপমৃত্যুর মামলা করা হয়েছে। তবে ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন পাওয়ার পর পরিবারের সদস্যরা অভিযোগ দিতে চাইলে তা উল্লেখ করে মামলা করতে পারবেন।”
স্কুলশিক্ষার্থী মেয়েটির মৃত্যুর প্রকৃত কারণ, তার ওপর নির্যাতনের অভিযোগ এবং পুলিশ হেফাজতে হারপিক পানের বিষয়ে ওঠা অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্তের পাশাপাশি দলগত ধর্ষণের ঘটনায় জড়িতদের আইনের আওতায় নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন স্বজনেরা।