আজ, মঙ্গলবার | ৩১শে জানুয়ারি, ২০২৩ খ্রিস্টাব্দ | বিকাল ৩:৫৩


মুক্ত মাগুরা এবং ৭ ডিসেম্বর

জাহিদ রহমান : ১৬ ডিসেম্বর আমাদের বিজয় দিবসের অনেক আগেই মুক্তির স্বাদ গ্রহণ করে মাগুরাবাসী। ৭ ডিসেম্বর পাকহানাদার মুক্ত হয় গোটা মাগুরা মহকুমা। মাগুরাকে পাকহানাদার মুক্ত করতে মিত্রবাহিনীর পাশাপাশি অনন্য ভূমিকা পালন করে অধিনায়ক আকবর হোসেনের নেতৃত্বাধীন শ্রীপুরবাহিনী, হাজীপুর বাহিনীর মুক্তিযোদ্ধারা ছাড়াও এফএফ, বিএলএফসহ অন্যান্য মুক্তিযোদ্ধারা। সামাজিক নেতারাও বিভিন্নভাবে সহায়তা করে মাগুরা মুক্ত রাখতে সহায়তা করেন। এর আগে শ্রীপুর, মহম্মদপুর, মাগুরা এবং শালিখার বিভিন্ন জায়গাতে মুক্তিযোদ্ধাদের সাথে পাক বাহিনী এবং রাজাকারদের একাধিক ছোট-বড় যুদ্ধের ঘটনা ঘটে।

ডিসেম্বরের প্রথম সপ্তাহেই মাগুরাতে যুদ্ধের দৃশ্যপট বদলে যাওয়ার ইঙ্গিত আসতে থাকে। বিভিন্ন মারফতে খবর আসতে থাকে যে মিত্রবাহিনী যেকোনো সময় যশোর হয়ে মাগুরার দিকে চলে আসবে। এ খবর প্রথম আসে আকবারবাহিনী তথা শ্রীপুরবাহিনীর অধিনায়ক আকবর হোসেনের কাছে। ৩ ডিসেম্বর কলকাতায় অবস্থিত ফোর্ট উইলিয়ামস (ভারতের ইস্টার্ন বাহিনীর সদর দফতর) থেকে সংকেত পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ঐ রাতেই ভারতীয় বাহিনী চতুর্দিক থেকে বাংলাদেশে মুভ করে। ভারতের নবম ডিভিশন যশোর, ঢাকা হাইওয়েতে ঢুকে পড়ে। চতুর্থ ডিভিশন মেহেরপুরকে পাশ কাটিয়ে ছুটে চলে কালিগঞ্জ ঝিনেদার দিকে। পাক নবম ডিভিশনের সদর দফতর ছিল যশোর ক্যান্টনমেন্টে। কিন্তু আনুষ্ঠানিক লড়াই শুরু হওয়ার আগেই সদর দফতর মাগুরার দিকে নিয়ে যাওয়া হয়।

৬ তারিখ সন্ধ্যা হতে না হতেই পাকবাহিনীর সবাই নিরবে বা গোপনে বিভিন্ন পথে বা রুটে যশোর ক্যান্টনমেন্ট ত্যাগ করে। ৫ ডিসেম্বর পাকসেনারা বুঝতে পারে যশোর দুর্গ কোনোভাবেই রক্ষা করা সম্ভব হবে না। উল্লেখ্য যে এদিন সকাল ও দুপুরে ভারতের সীমান্ত এলাকায় পাকিস্তানের নবম ডিভিশনের সঙ্গে ভারতীয় নবম পদাতিক ও চতুর্থ মাউন্টেন ডিভিশনের প্রচন্ড লড়াই হয়। বেনাপোল অঞ্চলে দায়িত্বরত লে. কর্ণেল শামসকে নওয়াপাড়ার দিকে দ্রুত সরে যাওয়ার নির্দেশ দেন পাকিস্তানি ব্রিগেডিয়ার হায়াত। নিজের ব্রিগেড নিয়ে রাতের আঁধারে গোপনে যশোর ক্যান্টনমেন্ট থেকে হায়াত পালান খুলনার দিকে। পালানোর সময় ৫ ও ৬ ডিসেম্বর শহরতলীর রাজারহাটসহ বিভিন্ন স্থানে মুক্তিবাহিনীর সঙ্গে তাদের মুখোমুখি লড়াই হয়। উল্লেখ্য যে, মুক্তিযুদ্ধের সময় মেজর জেনারেল এমএইচ আনসারীর নেতৃত্বে যশোর এলাকায় মোতায়েন করা হয়েছিল নবম ডিভিশন। এ ছাড়া ১০৭ ব্রিগেড যশোরে এবং ৫৭ বিগ্রেড ঝিনেদা-মাগুরাতে মোতায়েন করা হয়েছিল। আর মেজর মকমত হায়াত খানের নেতৃত্বে ১০৭ পদাতিক বাহিনী সক্রিয় ছিল মাগুরা শহরে। ডিসেম্বরের শুরুতে ভারত-পাক সীমান্তে তুমুল উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে।

৬ ডিসেম্বর বিকেলে মিত্রবাহিনীর কমান্ডার জেনারেল বারাতের নেতৃত্বে মিত্রবাহিনী ও মুক্তিবাহিনী যৌথ পরিকল্পনা ও প্রচেষ্টায় যশোর সেনানিবাসের নিয়ন্ত্রণ গ্রহণ করে। এই ধারাবাহিকতায় ৭ ডিসেম্বর শত্রæমুক্ত হয় মাগুরা শহর। এর আগে ৪ ডিসেম্বর শ্রীপুর বাহিনীর অধিনায়ক আকবর হোসেন শ্রীপুরের সন্তান ক্যাপ্টেন এটিএম আব্দুল ওয়াহ্হাব মারফত এই মর্মে খবর পান যে মাগুরাতে পাক বাহিনীর অবস্থান সম্পর্কে মিত্র বাহিনীকে একটি মানচিত্র পাঠাতে হবে। শ্রীপুর বাহিনীর রেকি সারঙ্গদিয়ার গ্রামের আব্দুল ওহাব জোয়ার্দার ওরফে বাঁশী জোয়ার্দারকে দিয়ে মানচিত্র তৈরি করে ক্যাপ্টেন আব্দুল ওয়াহ্হাবের কাছে প্রেরণ করেন অধিনায়ক আকবর হোসেন। ম্যাপ অনুযায়ী মিত্রবাহিনী প্রথমে আকাশপথে মাগুরায় অবস্থিত ওয়ারলে ভবনের আশে পাশে বোমা ফেলে। এই আক্রমণে ২৫০ জন পাকসেনা নিহত এবং ৮৭ জন আহত হয়। মিত্রবাহিনীর আক্রমণে পাকবাহিনী হতাশ হয়ে পড়ে এবং শহর ছেড়ে দিকবিদিক পালাতে থাকে।

এদিকে ৬ ডিসেম্বর শ্রীপুরের শ্রীকোলে ৩ জন পাকসেনা শ্রীপুর বাহিনী তথা আকবর বাহিনীর হাতে ধরা পড়ে। বিজয়ের নেশা এবং পরিকল্পনায় আকবর বাহিনীর মুক্তিযোদ্ধারা মাগুরা শহরের দিকে সংঘবদ্ধ হয়ে অগ্রসর হতে শুরু করে। কিন্তু মিত্রবাহিনী ও পাকবাহিনীর মধ্যে আক্রমণের আশঙ্কায় আকবর হোসেন মিয়া তার বাহিনীর সবাইকে শহরের পাশেই নিজনান্দুয়ালী গ্রামে সতর্ক অবস্থানের নির্দেশ দেন। মিত্রবাহিনী ও শ্রীপুর বাহিনীর যৌথ আক্রমণে পাকবাহিনী পারনান্দুয়ালী গ্রাম ছাড়াও নিকটস্থ বেলনগর গ্রামেও আশ্রয় নেয় এবং মাঝে মাঝে মর্টার ফায়ার দিতে থাকে। পারনান্দুয়ালীর বাটুল মিয়ার মাধ্যমে অধিনায়ক আকবর হোসেন মিয়া পাক-মেজরদের আত্মসমর্পণের আহ্বান জানান। কিন্তু সাধারণ সিপাহীরা আত্মসমর্পণ করতে চাইলেও অফিসাররা আত্মসমর্পণ করতে অস্বীকার করে। এমনকি একজন মেজর বলেন, ‘পাকসেনারা আত্মসমর্পণ করতে জানে না।’

৭ ডিসেম্বর ভোরে শ্রীপুর বাহিনীর শত শত মুক্তিযোদ্ধা মাগুরা শহরের বিভিন্ন স্থানে প্রবেশ করে। মুক্তিযোদ্ধাদের দেখে শহরের লোকেরা পরিত্যক্ত বাড়িতে ফিরে আসে। আকবর হোসেন মিয়া তার বাহিনীর সদস্যদের বিভিন্ন জায়গায় নিজ নিজ কমান্ডারের নেতৃত্বে অবস্থানের নির্দেশ দেন। আকবর হোসেন মিয়া নবুয়ত মোল্লাকে নিয়ে শহর ঘুরে প্রত্যেককে নিজ নিজ অবস্থান এবং দায়িত্ব সম্পর্কে সজাগ করে দেন। মাগুরা স্লুইচ গেটের কাছে ও তার আশপাশে মজবুত ব্যুহ তৈরি করা হয়, যাতে পাকবাহিনী মাগুরা ঢুকতে না পারে। বিকাল পাঁচটা থেকে মিত্রবাহিনী পিটিআই এর নিকট অবস্থান গ্রহণ করে। ৮ ডিসেম্বর ভোরে আকবর হোসেন মিয়া আব্দুল লতিফকে সঙ্গে নিয়ে মেজর চক্রবর্তীর কাছে যান এবং সেখানে গিয়ে দেখেন মেজর চক্রবর্তী প্রস্তুত। তিনি ও আকবর হোসেনসহ উপস্থিত সবাই ট্যাঙ্কে উঠেন। ট্যাঙ্ক বাহিনী এগিয়ে পারনান্দুয়ালী পার হতেই এন্টি ট্যাঙ্ক মাইন বিস্ফোরণে তৃতীয় ট্যাঙ্কটি খালে উল্টে যায়। ট্যাঙ্কে অবস্থানরত ৭ জনের মধ্যে ৩ জনই ঘটনাস্থলে প্রাণ হারায়। বাকি ৪ জন গুরুতর আহত হয়। মিত্রবাহিনী যাতে পার হতে না পারে সেই জন্য পাকসেনারা ডাইভারশন ক্যানেলের ব্রিজটি আগুনে পুড়িয়ে দেয়। মেজর চক্রবর্তীর নির্দেশে হ্যাঙ্গিং ব্রীজ নির্মিত হয়। এতে সহযোগিতা করেন মিত্রবাহিনীর প্রকৌশলী এবং স্থানীয় শ্রমিকরা। ক্যাপ্টেন ওয়াহ্হাব তার দলবল নিয়ে মাগুরা পৌছেন এবং ডাকবাংলায় সবাই মিলে আলোচনা করেন। আকবর বাহিনীর মুক্তিযোদ্ধারা মিত্রবাহিনীর সাথে একত্রিত হয়ে পাকসেনাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে লিপ্ত হয় এবং মাগুরা শত্রæমুক্ত করে।

এখানে উল্লেখ্য যে, মুক্তিযুদ্ধের সময় পশ্চিম বাংলার মুখ্যমন্ত্রী ছিলেন ক্ষমতাসীন কংগ্রেসের অজয় মুখার্জী। বিরোধী দলীয় নেতা ছিলেন সিপিএমএর জ্যেতি বসু। ৮ মে পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভায় মুখ্যমন্ত্রী অজয় মুখার্জ্জী বাংলাদেশকে স্বীকৃতিদানের প্রস্তাব রাখেন। ১৯৭১ সালের ৬ ডিসেম্বর ভারত বাংলাদেশকে স্বীকৃতি প্রদান করে। এ সম্পর্কিত এক বিবৃতিতে ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী বলেন, বাংলাদেশের জনগণ শত বাধাবিপত্তি ডিঙ্গিয়ে স্বাধীনতা সংগ্রামের ক্ষেত্রে পৃথিবীর ইতিহাসে একটি নতুন অধ্যায়ের সূচনা করেছে। ৭১ সালে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে মিত্রবাহিনীর প্রায় ১ লাখ সৈন্য অংশগ্রহণ করে। ৩ ডিসেম্বর থেকে ১৬ ডিসেম্বর পর্যন্ত ১৪ দিনের সরাসরি যুদ্ধে ভারতের প্রায় ৪ হাজার সৈন্য মারা যায়।

অধিনায়ক আকবর হোসেন ‘আমি ও আমার বাহিনী’ বইটিতে লিখেছেন- ৪/১২/৭১ তারিখে আমরা খবর পেলাম ক্যাপ্টেন ওহাবের কাছে অয়ারলেছ করা হয়েছে যে এক দিনের মধ্যে মাগুরার অবস্থানরত পাকসেনাদের পরিজশনের একটা মানচিত্র তৈরী করে দিতে হবে।আমাদের বাহিনীর রেকি আঃ ওহাব জোয়ার্দ্দার ওরফে বাঁশী মিয়াকে পাঠালাম। যথাসময়ে মিলিটারি পজিশনের ম্যাপ তৈরি হয়ে এল। সঙ্গে সঙ্গে বিশেষ দূতের মাধ্যমে ম্যাপ পাঠিয়ে দেয়া হল। ক্যাপ্টেন আব্দুল ওহাবের কাছে। ম্যাপ অনুযায়ী মিত্র বাহিনী আকাশ পথে ভায়নার ওয়ারলেসের পাশে বোমা ফেলে। এই আক্রমণে মাগুরার ২৫০ জন পাকসেনা মারা যায় এবং ৮৭জন গুরুতর রূপে আহত হয়। আহত ব্যক্তিদের চিকিৎসার জন্যে স্থানীয় হাপাতালে ভর্তি করা হয়। মিত্র বাহিনীর এই আক্রমণে পাকসেনারা খুবই হতাশ হয়ে পড়ে। এসময়ে একদিন দেখলাম পাকবাহিনীর একখানা কালো রঙের ফাইটার বিমান খুব নিচু হয়ে আমাদের গ্রামের উপর দিয়ে উড়ে যায়, ঝিনেদার দিকে। কিন্তু ঝিনেদা পৌছনোর পূর্বেই এক বিকট শব্দ শোনা গেল। পরক্ষণেই দেখলাম বিমানটা পুররায় ঢাকার দিকে ফিরে গেল। এতে আমার মনে হল বিমানটির চালক বর্ডারের দিকে এগোতে শঙ্কাবোধ করে পথেই কোথাও বোমা নিক্ষেপ করে ঢাকার দিকে পলায়ন করল।

৬/১২/৭১ তারিখে ভোর বেলা খবর পেলাম তিনজন পাকসেনা খালি গায়ে মাত্র একটা অস্ত্র নিয়ে আমাদের শ্রীকোল ইউনিয়নের রামনগর গ্রামের একটা বাড়িতে প্রবেশ করেছে। আমরা খুব তাড়াতাড়ি সেখানে সেখানে গিয়ে তাদেরকে ধরে ফেলি এবং একটা জি-৩ রাইফেল তাদের নিকট থেকে উদ্ধার করা হয়। লক্ষ্য করলাম মিলিটারী তিনজন ক্ষুধায় অত্যন্ত ক্লান্ত হয়ে পড়েছে। সেখানে সবাই আমাকে উদ্দেশ্য করে বলল, ‘স্যার, ওদের মেরে ফেলে দেন’। আমি তাদেরকে বললাম না এখনই ওদেরকে মেরে ফেলা যাবে না আপাততঃ আটক রাখা যাক তার পর যা হয় করা যাবে।

তিনজন পাকসেনা আমাদের হাতে ধরা পড়ার পর এলাকায় বিপুল আলোড়ন সৃষ্টি করে এবং খুবই সংক্ষিপ্ত সময়ের মধ্যে সমস্ত এলাকায় মুক্তিযোদ্ধারা খামারপাড়া ক্যাম্পে গুটিয়ে এলো অতঃপর আমরা মনস্থ করলাম সত্ত¡র মাগুরা ঢুকতে হবে। সিদ্ধান্ত গৃহিত হবার পর পরই আমরা সবাই মিলে বীরদর্পে মাগুরা রওয়ানা হলাম। বাকীদলগুলোও পথিমধ্যে এসে যোগ দিল। গাংনালিয়া বাজার ও আঠারখাদা মাঠ পার হয়ে যখন আমরা ধীর পদেভরে সুশৃক্সখলভাবে যাচ্ছিলাম তখন যে দৃশ্যের অবতারণ্য হয়েছিল তা আজও ভুলিনি। প্রত্যেকের চোখে মুখে প্রতিভাত হয়েছিল চরম বিজয়োল্লাস। মহান বিজয় অভিযানে আমরা যেন চলেছি। পিছনে তাকাবার আজ যেন অবকাশ নেই। বিজয়টিকা আমাদের যেন হাতছানি দিয়ে ডাকছে। সবাই ব্যস্ত-কে বা কনো দল আগে পৌঁছাবে।

এই ঐতিহাসিক অভিযানে আমার সহযোগী হয়ে বীর দর্পে চলছিল কোম্পানী কমান্ডার আনারুদ্দিন ইপিআর (পূর্ব শ্রীকোলে), কোম্পানী কমান্ডার বদরুল আলম, আমী (বেলনগর), কোম্পানী কমান্ডার আব্দুল ওহাব (টুপিপাড়া), কমান্ডার মাকুমিয়া, কমান্ডার আব্দুল মান্নান ইপিআর, কমান্ডার আশরাফউদ্দিন আহমদ, ইপিআর কমান্ডার আ. আজিজ, ইপিআর কমান্ডার আব্দুল খালেক (মধুপুর), কমান্ডার মোশারফ (মজা) ইপিআর কমান্ডার সিরাজুল ইসলাম ইপিআর (সিগন্যাল, কমান্ডার আব্দুর রাজ্জাক (নান্নু), আমী (কাশীয়ানী); কমান্ডার মনিরুল ইসলাম (জেন্টাল) আর্মী, কমান্ডার আব্দুল মালেক, আর্মী (আমতৈল), কমান্ডার মনোয়ার হোসেন, (নোহাটা), আকরাম হোসেন, পুলিশ: কমান্ডার আব্দুল কালাম, ইপিআর (ঘাসিয়াড়া), কমান্ডার হারেজউদ্দিন খান আনসার (বগুড়া) কমান্ডার আফজাল হোসেন, ইপিআর, কমান্ডার আব্দুল মান্নান, আনসার (রাইনগর), কমান্ডার মনোয়ার হোসেন, ইপিআর (বগুড়া) কমান্ডার ইদ্রিস আলী, (পূর্ব শ্রীকোল), কমান্ডার ওলিয়ার মৃধা (খামারপাড়া), কমান্ডার হাফিজার রহমান, (বিষ্ণুপুর), কমান্ডার সুলতান আহমদ (বিষ্ণুপুর), কমান্ডার নওশের আলী, বেঙ্গল রেজিমেন্টে (দ্বারিয়াপুর) এফএফ কমান্ডার আইনন্দিন (বগুড়া), এফএফ কমান্ডার এনামুল কবির (বারাশিয়া), সহকারী কমান্ডার সাইদুর রাব্বি ও নুরুজ্জামান। ডেপুটি কমান্ডার আবু ইছাম, এফএফ কমান্ডার নুরুল হুদা (পল্টু), ডেপুটি কমান্ডার সুবীর কুমার (নিজনান্দুয়ালী); এফ.এফ কমান্ডার জহুর-ই আলম (শেখ পাড়া), এফএফ কমান্ডার নীরু, ডেপুটি কমান্ডার নাসিমুজ্জামান (মিনু) (টুপিপাড়া), এফ. এফ কমান্ডার সামছু (গোপালপুর), মুজিব বাহিনী কমান্ডার আব্দুর রহমান (দূতে), ডেপুটি আতিয়ার রহমান (টুপিপাড়া) ডেপুটি সিরাজুল ইসলাম (খামার পাড়া) এবং তাদের অধিনস্থ সহস্্রাধিক মুক্তিসেনা। সাধারণ মুক্তিযোদ্ধাগনের মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিলেন সুলতান, আব্দুল লতিফ, শহিদুল ইসলাম (রাজা), নজরুল ইসলাম (আসাদ), আবু বকর, হাবিবুর রহমান আব্দুর রশিদ, রুস্তম আলী, মোকছেদ আলী, মোক্তাদের রহমান, ইলাহী রহমান, বাবু আলী খাঁ, শাহাবুদ্দিন খাঁ, ইরাদুল ইসলাম (ফয়েজ), খোকন, ইপিআর ইছহাক, ইপিআর গোলাম মোস্তফা, (বারুইপাড়া) আবুল হোসেন (পাল্লা); ইসলাম (হরিন্দী), আব্দুল ওহাব (কাবিল পুর) আবু হোসেন এবং জহুর, জাহিদ প্রাক্তন বৈমানিক (বেল নগর) বাঁধভাঙ্গা ¯্রােতের ন্যায় উদ্যাম গতিতে চলছিল মুক্তিসেনারা। আমার সঙ্গে হেঁটেও দৌড়ে যারা ইতিপূর্বে বরাবরই হার মেনেছে, তাদের কাছে আজ যেন আমি বরাবরই পরাস্ত হচ্ছি। মোল্লা নবুয়ত আলী, খন্দকার নাজায়েত আলী, হাফিজ মাষ্টার, মোল্লা শাহাদাৎ আলী, মোল্লা নুরুল হোসেন, ইতিমধ্যেই মাগুরার নিকটবর্তী পৌঁছে গেছেন। কেউবা মাগুরাতে ঢুকে পড়েছেন। এতক্ষণে আমি মাগুরা কাঠের ব্রীজের নিকট এসে পৌঁছে গেছি। সময় তখন ১১টা। আমার হঠাৎ স্মরণ হল যে এখনই মিত্র বাহিনীর হাওয়াই আক্রমণ শুরু হয়ে যাবে। আমি অতিসত্ত¡র লোক মারফত খবর পাঠালাম মুক্তিযোদ্ধারা যেন এখনই নিজনান্দুয়ালী গ্রামে ফিরে আসে। মুক্তিসেনারা অতি ক্ষিপ্র গতিতে আমার কাছে ফিরে এল।

কিছুক্ষণের মধ্যেই দেখা গেল মিত্র বাহিনীর কয়েকখানা ফাইটার বিমান মাগুরা শহরের উপরে চক্কর দিচ্ছে। আমি বললাম, “তোমরা যে যেখানে আছ মাটিতে শুয়ে পড়, মুখে কাপড় ঢুকাও। এখনই বোম্বিং শুরু হবে।” সবাই আমার আদেশ পাবার সাথে সাথেই শুয়ে পড়ল ও মুখের মধ্যে কাপড় ঢুকাল। আমি অনুরূপ করে, দেখছিলাম হাওয়াই জাহাজগুলি চক্র দিয়েই মাগুরা ওয়াপদা গোডাউনের উপর “ছো দিয়ে ব্রাশ ফায়ার শুরু করল। শেলগুলি স্পষ্ট দেখা যাচ্ছিল। সঙ্গে সঙ্গে ওয়াপদা গোডাউনে আগুন ধরে গেল। ধোঁয়ায় আকাশ মেঘাচ্ছন্ন হয়ে গেল। সেই সঙ্গে আরো কয়েকটা প্লেন শহরের মাঝখানে ব্রাশ ফায়ার শুরু করল। কয়েক দফা এরুপ করে ফিরে গেল। যে মুহুর্তে আমাদের মুক্তিসেনারা আমার নিকট ফিরে এসেছিল; সেসময় খবর পেলাম পাকসেনাদের একটা দল যারা সিও অফিসের উত্তর দিকে অবস্থিত স্কুলে আগুন ধরিয়ে তাদের অফিস পোড়াচ্ছে এ অবস্থায় আমাদের মাগুরায় প্রবেশ করা সমিচীন নয় বলে মনে করলাম এবং কাউকে প্রবেশ করতে দিলাম না। এ সময়ে আমাদের একজন হিতৈষী পারনান্দুয়ালীর বাটলু মিয়া এসে খবর দিল পাকসেনারা আমাদের কাছে আত্মসমর্পণ করতে চায়। আমি বাটুল মিয়ার মাধ্যমে মেজর সাহেবের বরাবরে একটা চিঠি দিলাম। তাতে লেখা ছিল, “মেজর সাহেব, আপনারা আত্মসমর্পণ করলে আপনাদের কোন ক্ষতি হবে না।” কিন্তু পত্রবাহক ফিরে এসে আমাকে জানালো যে সাধারণ সিপাইরা আত্মসমর্পণ করতে চাইলেও অফিসার মহল কোনক্রমেই আত্মসমর্পণ করতে রাজী নয়। একজন মেজর বলেছেন, পাকসেনারা আত্মসমর্পণ করতে জানে না। সুতরাং এ প্রয়াস ব্যর্থ হয়ে গেল। পরক্ষণেই দেখা গেল মাগুরার উপর পাকসেনারা শেল বর্ষণ করে চলেছে। খবর পেলাম এতে কয়েকজন শিশু ও ১জন মহিলাসহ ২জন বৃদ্ধ লোকের মৃত্যু ঘটেছে। শেলগুলি নিজনান্দুয়ালী গ্রামের দিকে পড়েনি। যে সকল পাকসেনা কলেজ ও সিও অফিসের দিকে অবস্থান করছিল, তারা এখন সবাই পারনান্দুয়ালী গ্রামের দিকে সরে গেছে। শহরে আর ঢোকেনি। শেলবর্ষণের কারণে আমরা আর শহরে প্রবেশ করা সমিচীন মনে করলাম না। এভাইে দিনটা অতিবাহিত হয়ে গেল।

মুষ্টিমেয় কয়েকজন মুক্তিসেনাকে শহরের অবস্থা অবলোকন করার জন্য খালি হাতে পাঠালাম। তারা যথাসময়ে ফিরে এসে জানাল যে, শহর প্রায় জনশূন্য, লোকচলাচল নেই বললে চলে। অবশ্য আমরাও দেখলাম, মাগুরা শহরের প্রায় সব লোকই পাশ্ববর্তী সব গ্রামে আশ্রয় গ্রহণ করেছে। এসময়ে আমরা নিজনান্দুয়ালী গ্রামের বাদশা মিয়ার বাড়ীতে অবস্থান করছিলাম। সেখানে আরও যারা আশ্রয় নিয়েছিলেন তাদের মধ্যে অধিকাংশই ছিলেন অফিসার মাগুরার মহকুমা প্রশাসক জনাব মতিউর রসুল এর মধ্যে ছিলেন। আমাদের বিজয় হোক এটাই তিনি কামনা করতেন। তিনি ছিলেন অতি অমায়িক ও শান্তশিষ্ট।

সন্ধ্যার কিছু পূর্বেই আমরা পাশ্ববর্তী গ্রামে নালেরডাঙ্গী অভিমুখে রওয়ানা হলাম। রাতের খাওয়া দাওয়ার পর্ব শেষ করে সে রাত্রে আমরা এ গ্রামেই অবস্থান করার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করলাম। গভীর রাতেও আমাদের কাছে পাকসেনাদের অবস্থানের খবরাখবর এসে পৌঁছতে লাগল। সর্বশেষ খবরে জানতে পারলাম যে, পাকসেনারা পারনান্দুয়ালী গ্রাম ছাড়াও নিকটস্থ বেলনগর গ্রামেও আশ্রয় নিয়েছে এবং সেখানে থেকে মাঝে মাঝে মর্টার ফায়ার দিচ্ছে।

পরদিন ভোরে আমরা সবাই মিলে মাগুরার ঢুকে পড়লাম। আমরা শহরে প্রবেশ করার পরপরই শহরের লোকেরা তাদের পরিত্যাক্ত ঘর বাড়ীতে ফিরে আসতে থাকে। এ সময়ে শহরের সব মানুষকেই কিছুটা সন্ত্রস্ত বলে বোধ হচ্ছিল। আমি পূর্বে আমাদের মুক্তিযোদ্ধাদের দায়িত্ব, কর্তব্য সম্পর্কে সজাগ করে দিয়েছিলাম এবং আমার নির্দেশ অনুসারে তারা নিজ নিজ কমান্ডারের নিয়ন্ত্রণাধীননে স্ব-স্ব  পজিশনে অবস্থান নিল।

মোল্লা নবুয়াত আলী এবং আমি রিক্সায় ঘুরে তাদের দেখে এলাম ও স্বাভাবিক দায়িত্ব পালনে তাদেরকে পুনরায় সজাগ করে দিলাম। এল.এম.জি তিনটি পার্টিকে কুমার নদের ধারে ধারে পজিশন নেবার জন্যে নির্দেশ দেওয়া হল। মাগুরা শ্লুইজগেটের নিকট ও তার আশপাশে মজবুত ব্যুহ রচনা করা হলো যাতে পাকসেনারা পুনরায় মাগুরা শহওে প্রবেশ করতে না পারে। অবশ্য পাকসেনাদের মাগুরায় ঢোকার আর কোন নমুনা পাওয়া গেল না। কোন অবস্থায় নদী অতিক্রম করার কোন অনুমতি দিলাম না। দুপুর বেলা কে বা কারা আমাদের খানা তৈরি হয়ে গেছে বলে আমাকে জানাল। একদল মুক্তিযোদ্ধা যারা শহরের মধ্যখানে কর্তব্যরত ছিল তারাও এসে জানাল যে আমাদের খানা তৈরি হয়ে গেছে। আমি আর অন্য কিছু চিন্তা না করে খাবার সম্মতি দিলাম।

ইতিমধ্যে বেলা ১১ টার সময় মাগুরার সব অফিসার ও স্থানীয় গণমাণ্য ব্যক্তিদের উপস্থিতিতে ট্রেজারী ঘরে এক সভা আহ্বান করে সংশ্লিষ্ট সকলের উদ্দেশ্যে বলা হয় যে, আপনার নিজ নিজ কর্মস্থলে অবস্থান করবেন। সুষ্ঠুভাবে নিজ নিজ দায়িত্ব পালন করেন। ভয়ভীতির কোন কারণ নেই। যারা কোন অপরাধে অপরাধী হবেন বাংলাদেশ সরকার আইন অনুযায়ী তাদের বিচার করবেন। কেউই নিজ নিজ দায়িত্ব-কর্তব্য থেকে বিচ্যুত হবেন না। যে কোন প্রয়োজনে আমরা আপনাদের সাহায্য চাইতে পারি। মিত্র বাহিনীর সেনারা সত্তর মাগুরা এসে যাবেন ব্যাংক বা ট্রেজারীতে যেসব পুলিশ কর্তব্যরত আছেন তারা অবশ্যই তাদের দয়িত্ব পালন করে যাবেন।” আমিও একদল মুক্তিসেনাকে দায়িত্ব পালনের উদ্দেশ্যে পাঠালাম দেখলাম, পুলিশ যে যেখানেই ছিল তারা যেন শরীরের সব জোর হারিয়ে ফেলেছে বলে মনে হতে লাগল। থানায় যেসব পুলিশ ছিল তারাও যেন ভয়-ভীতিতে একেবারে জড়সড়-বাঁচে কি মরে এমনি ভাব। তাদেরকে খানা ছেড়ে আর কোথাও না যাবার জন্য নির্দেশ দিলাম। সংশ্লিষ্ট সকলকে বললাম, যেকোন ঘটনার উদ্ভব হলে বা কোন সমস্যা দেখা দিলে আমার কাছে সরাসরি জানালে তার উপযুক্ত ব্যবস্থ নেওয়া হবে।

এদিকে দেখতে পেলাম রাজাকারদের এক এক করে মুক্তিসেনা পাকড়াও করে আনছে। আমি তাদের জেল হাজতে পাঠাতে লাগলাম। আমার দেওয়া স্লিপ পেলেই সিপাইরা তাদেরকে জেল হাজতে ঢুকিয়ে দিত। কাউকে হত্যা বা মারধর করার কোন প্রকার অরাজকতা বা বিশৃক্সখলার সৃষ্টি হয়নি। কোন প্রকার লুটতরাজ বা অন্যায়ভাবে কাউকে হয়রানি মুক্তিসেনারা করেনি। এসময়ে আমি তাদের সুষ্ঠুভাবে নিজ নিজ কর্তব্য পালনের দায়িত্ব এবং আন্তরিকতা দেখে মুগ্ধ হয়েছি। আমার কাছে তাদের বিরুদ্ধে কোন অভিযোগ আসেনি।

পাকসেনারা মাগুরায় মুলত; পিটিআই এবং সিও অফিস এবং কোয়ার্টারে অবস্থান করছিল। এসব জায়গা ছেড়ে যাবার পর আমরা পাকসেনাদের পরিত্যক্ত যাবতীয় মালামাল রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব মুক্তিসেনাদের ওপর অর্পণ করি। মেজর চক্রবর্তী মাগুরাতে এসেই আমাকে খোঁজ করেন। কিছুক্ষণ পরে আমার সাথে তার সাক্ষাৎ হল।

আমার প্রতি তার স্বতঃস্ফুর্ত সুব্যবহার এবং সম্মানবোধ আমাকে স্বভাবতই আনন্দিত করে। আমার কাছে তিনি অত্যন্ত ভাল মানুষ বলে বোধ হলো। কুশলাদি বিনিময়ের পর তিনি আমাকে বলেন, “আগামী কাল সকালে অবশ্যই আসবেন; আমার ট্যাংকে আপনাকে যেতে হবে।” আমি সম্মতি জ্ঞাপন করলাম।

রাতের খাওয়ার পর্ব সন্ধ্যার পরপরই সমাপ্ত হয়। আমি তাড়াতাড়ি ডিউটি পরিদর্শনে বেড়িয়ে পড়লাম। দেখা গেল মিত্রবাহিনীর জোয়ানরা পিটিআই-এর নিকটবর্তী স্থানে অবস্থান গ্রহণ করে ডিউটিরত রয়েছে। কিন্তু ওদের জন্য প্রস্তুত ট্রেন্সগুলি দেখে খুব খুশী হতে পারলাম না। কেননা ওগুলি আমার কাছে খুব নিরাপদমূলক বলে মনে হল না। দেখলাম অফিসারগণ পিটিআই সংলগ্ন ইমারতগুলি অবস্থান গ্রহণ করেছেন। ট্যাঙ্ক বাহিনী ও তাদের আশেপাশে সুসজ্জিত রয়েছে বিভিন্ন ভাষাভাষির অফিসার লক্ষ করলাম। পাঞ্জাবী, মারাঠী, বাঙালি সবাই আছেন। সোপাইদের মধ্যে অধিকাংশই দেখলাম পাঞ্জাবী ও মারাঠী।

পরিদর্শনকালে দেখতে পেলাম আমাদের মুক্তিসেনারা তাদের নিজ নিজ দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করে যাচ্ছে। আমি সবার অবস্থান সরেজমিনে তদারক করে এলাম। মোল্লা নবুয়াত আলীও তার দায়িত্ব পালন করে এসে আমার সঙ্গে সাক্ষাত করলেন। ইতিমধ্যে আমি মাগুরা ডাকবাংলা ও ওয়াপদা ডাকবাংলা পরিদর্শন করে সেখানে টেলিফোন যোগাযোগের ব্যবস্থা করে ফেলেছি। পাকসেনারা এ সকল অবস্থান পরিত্যাগের সময় এগুলি বিনষ্ট ও বিচ্ছিন্ন করে গিয়েছিল। অতঃপর আমি অ্যাডভোকেট চৌধুরী মোশারফ হোসেন সাহেবের বাসায় ফিরে এলাম। জায়গাটা আমার প্রিয় ছিল। কেননা এটা খুবই নিরিবিলি বলেই বোধ হচ্ছিল। লোকজন প্রায় ছিল না। এটাকে তাই আমরা প্রধান আস্তানা হিসেবে ব্যবহার করতে লাগলাম। যে কোন প্রয়োজনে মুক্তিসেনারা এখানে যোগাযোগ করত। চলাফেরার সময় আমার সঙ্গে আমার একান্ত অনুগত আব্দুল লতিফ ও সুলতান (কাঁচের কোল) আমার সঙ্গে থাকত। তাদের হাতে জি-৩ রাইফেল সদা প্রস্তুত থাকত, তাদের মত অতি বিশ্বস্ত সহচর আমি খুবই কমই পেয়েছি। তাদের এটাই সবচেয়ে বিশেষত্ব ছিল যে কোন লোক আমার সঙ্গে সাক্ষাতে জন্যে আসলে তারা যেন বুঝতে পারত কেন সে এসেছে। কোন অবস্থাতেই তারা আমাকে চোখের আড়াল হতে দিত না। আমার এই বাহিনীর সৃষ্টি লগ্ন থেকেই তারা আমার অনুচর হিসেবে কাজ করছিল, আমি যদি কখনও তাদের ছুটি নিতে বলেছি তারা সহাস্যে তা প্রত্যাখ্যান করেছে, বলত “দেশ স্বাধীন না হওয়া পর্যন্ত আমাদের ছুটি নাই। স্বাধীন হলে তবেই বাড়ী ফিরে যাব।”

পরদিন ভোরে আমি আব্দুল লতিফকে সঙ্গে করে মেজর চক্রবর্তীর অফিসে যেতেই দেখলাম উনি প্রস্তুত হয়ে দাঁড়িয়ে রয়েছেন। চারিদিকে একবার চোখ ফিরিয়ে দেখলাম অন্যান্যরাও সবাই প্রস্তুত। কিছুক্ষণ পরেই ঠাকুর এসে সবার ললাটে রক্তজবাফুল ও সিন্দুরের টিপ এঁকে দিয়ে যেতে লাগলেন। অনতিবিলম্বেই আমরা মেজর চক্রবর্তীর ট্যাংকে উঠে পড়লাম। মেজর সাহেবও উঠে গেলেন। সবার আগে আগে ট্যাংক বাহিনী চলতে শুরু করল। আমাদের আগে চারটা ট্যাংক বীরদর্পে এগিয়ে চলছিল। কিন্তু পারনান্দুয়ালী গ্রাম পার হয়েই এ্যান্টি ট্যাংক মাইন বিস্ফোরণে মিত্র বাহিনীর একটা ট্যাংক সহসা খাদে উল্টে পড়ল। ট্যাংকটা ছিল তৃতীয় নম্বরের। ট্যাংকে অবস্থানরত ৭জনের মধ্যে তিনজন সাথে সাথেই মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ল এবং বাকী ৪জন গুরুতরভাবে আহত হলো। সঙ্গে সঙ্গেই মিত্রবাহিনীর সাঁজোয়া গাড়ী এগিয়ে গেল এবং মেডিক্যাল টিম আহতদের সরিয়ে নিল। পরক্ষণেই ট্যাংক মেরামতের কাজ শুরু হয়ে গেল। ভাবলাম দেশ উদ্ধারের কাজে আমাদের জীবন অপরিহার্য কিন্তু মিত্রবাহিনীর জীবন? এরাইতো প্রকৃত বন্ধু যারা আমাদেও জন্য জীবন দিয়ে গেল।

আমাদের ট্যাংকটি ছিল পঞ্চম। আমরা ডাইভারশন ক্যানেলে পৌঁছাতে না পৌঁছাতে দেখামাত্র মিত্র বাহিনীর সব ট্যাংক আশপাশ দিয়ে নেমে গতি বাড়িয়ে দিয়েছে এবং ক্যানেলের মধ্যে নেমে এসেছে। কিছুক্ষণের মধ্যেই ওপার গিয়ে উঠলে। জানতে পারলাম ট্যাংকগুলি সবই জলে স্থলে সমানভাবে চলতে সক্ষম এবং দ্রুতগামী। এগিয়ে দেখলাম ডাইভারশন ক্যানেলের কাঠের ব্রিজটি আগুনে পুড়ছে। পাকসেনারা পালিয়ে যাবার সময় ব্রিজটিকে আগুন ধরিয়ে দিয়ে গেছে যাতে মিত্র বাহিনী পারাপার হতে না পারে। মেজর চক্রবর্তী হ্যাঙ্গিং ব্রিজ তৈরি করার নির্দেশ দিলেন। মিত্রবাহিনীর প্রকৌশলীগণ মুহুর্তেও মধ্যে যাবতীয় লোহালস্কর এনে ফেললো। স্থানীয় লোকজনকে শ্রমিক জোগাড়ের কথা বলায় স্বল্প সময়ের মধ্যে প্রয়োজনীয় সংখ্যক শ্রমিকও জুটে গেল। দ্রুত ব্রীজ তৈরীর কাজ শুরু হয়ে গেল। ইতিমধ্যেই ক্যাপ্টেন এ.টি.এম. আব্দুল ওয়াহাব তার দলবল নিয়ে মাগুরায় পৌঁছে গেছেন। ওয়াপদা ডাকবাংলোতে তার সাথে আলোচনায় বসলাম। মিত্র বাহিনীর অবস্থান এবং পাকসেনাদের অবস্থান সম্পর্কেও বিস্তর আলোচনা করা হলো। এছাড়া মিত্রবাহিনীর সদস্যরা পিটিআই থেকে পাকসেনাদের মিলিটারী কিটস ও অন্যান্য যাবতীয পরিত্যক্ত জিনিস ট্রাকে করে নিয়ে গেল।

সে সম্পর্কে আলোচনা করলাম। অতঃপর আমি আমার আস্তানায় ফিরে এলাম। এদিকে পাকসেনাদের যুদ্ধ চলছেই। মিত্র বাহিনীরকে সহায়তা দান করার জন্যে আমাদের মুক্তিসেনা কমান্ডার মাকু মিয়া, আবুল হোসেন, হাফিজ (আর্মি), এরাদুল আখতার (ফয়েজ), আব্দুল হাফিজ (আর্মি) ও অন্যান্যরা মিত্র বাহিনীর পাশাপাশি যুদ্ধ করে চলেছে। মিত্র বাহিনীর জোয়ানরা আমাদেরকে শতমুখে প্রশংসা করছে। মিত্র বাহিনী বলতো “জিয়ো বাংলা” “আকবর বাহিনী জিয়ে রহ” মুক্তিযোদ্ধারা ও অনুরূপ সাড়া দিয়ে মনের আনন্দ প্রকাশ করত।

এদিকে মাগুরা প্রবেশ করে আমাদের খাওয়া দাওয়ার ব্যাপারে যে ব্যবস্থা অবলোকন করলাম-তা যেন এলাহি কারখানা। প্রথম ওয়াক্তে কেবলমাত্র মুক্তিসেনাদের খাবার ব্যবস্থা ছিল। দ্বিতীয় বেলায় লোকসংখ্যা দ্বিগুন হয়ে গেল। তৃতীয় ওয়াক্তে মনে হল রান্নবান্না আর খাওয়া দাওয়ার যেন শেষ নেই। যে আসছে সেই খাচ্ছে-কাউকে নিষেধ করার কোন জো নেই। হাজার হাজার লোক মাগুরায় এসে যাচ্ছে। যেন কতকাল তারা মাগুরায় আসেনি। তাদের খাওয়া দাওয়া সব ফ্রী অস্যংখ্যা লোক। কে কোথা থেকে আসছে তার কোন ঠিক নেই। দেখলাম রান্নাবান্নার ব্যাপারে পারনান্দুয়ালীর জনাব আবু বকর এবং মাগুরার জনাব বেনু মিয়া অগ্রণী ভ‚মিকা গ্রহণ করেছেন। বেনু মিয়াকে দেখেছিলাম সেই মুক্তিযুদ্ধ আরম্ভের সময় একবার আনসার ক্যাম্পে। তার কাঁধে ছিল একটা চাইনিজ স্টেনগান। বলতে কি, সেই ঝকঝকে চকচকে চাইনিজ স্টেনগানটার ওপর আমার লোভ হয়েছিল। আয়ত্ত¡ করতে পারিনি বলে মনে মনে কষ্ট ছিল। আজও দেখলাম সেই স্টেনটা তার কাঁধে ঝুলছে।

বিকেলের দিকে রাস্তায় লোকের দারুণ ভীড় জমে গেল আমাকে দেখার জন্যে। লতিফ, সুলতান, মৌলভী নাজায়েত আলী, হাফিজ মাষ্টার, আনারুদ্দিন, মকছেদ সবাই হয়রান হয়ে যাচ্ছে। সবাই আমার হিতৈষী, সবাই হাত মিলাতে বুক মিলাতে চাইছে। প্রচন্ড ভীড় শ্বাসরুদ্ধকর অবস্থা। এ পরিস্থিতিতে সবাই মিলে আমাকে পাশে পিছিয়ে নিয়ে গেল এবং একটা রিক্সার উপর আমাকে দাঁড়াতে অনুরোধ করল। সত্যি বলতে কি আমি রিক্শার উপর দাঁড়িয়ে যেন হাঁপ ছেড়ে বাঁচলাম। কে যেন ক্যামেরা দিয়ে ছবি ও তুলে নিল। সবাইকে আমার আন্তরিক শুভেচ্ছা ও মোবারকবাদ জানিয়ে উপস্থিত জনতার উদ্দেশ্যে বললাম- এ বিজয় আমাদের সবার। আপনারা আমাদের পাশে না থাকলে আমরা এ বিজয় কেতন ছিনিয়ে আনতে পারতাম না। মহান আল্লাহর ইচ্ছায় এবং জনগণের একান্ত আগ্রহে ও ঐকান্তিকতায় আমাদের দেশ স্বাধীন হতে চলেছে। এ জয়যাত্রার সবটুকু এদেশের জনগণের-আপনাদের। তাই আপনাদেরকে আমার বাহিনীর পক্ষ থেকে জানাই লাল সালাম। আপনার আমাদের জন্যে দোয়া করুন আমরা যে অবশ্যই স্বাধীনতা সূর্য্য ছিনিয়ে আনতে সক্ষম হই। সাথে সাথেই চতুর্দিক থেকে ধ্বনি উঠলো- মুক্তিবাহিনী-জিন্দাবাদ, আকবর হোসেন জিন্দাবাদ। জয় বাংলা। ইত্যবসরে আমরা জনতার পাশ কাটিয়ে আমাদের কর্তব্য কর্মে মন দেবার জন্যে সরে পড়লাম। জনতার কন্ঠধ্বনি তখনও সমগ্র মাগুরা প্রকম্পিত করে তুলছে। প্রথমেই মাগুরা সিও অফিসে উপস্থিত হলাম। সেখানে মুক্তিসেনা হাসান এফএফ, কমান্ডার হাফিজার রহমান (কাজলী), আঃ ওহাব বিশ্বাস (খামারপাড়া) ও আবেদ আলী কর্তব্যরত ছিল।

এই অংশে তিনি আরও লিখেছেন-তৃতীয় দিনের আরও উল্লেখযোগ্য ঘটনা হচ্ছে হাজীপুর এলাকার মুজিব বাহিনীর কমান্ডার আবুল খায়ের, আঃ হাই, মাজেদ খন্দকার, ভিকু মহম্মদপুর এলাকায় মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার ইয়াকুব আলী, নজরুল ইসলাম, আব্দুর রিশদ বিশ্বাস তাদের দলবলসহ মাগুরা পৌঁছে যায়। তাদের সাথে শুভেচ্ছা বিনিময় হলো। অনেকদিন পরে আমরা একত্র হলাম। তাদের নিকট বিশদভাবে জনতে পারলাম শহীদ দু’ভাই আহম্মদ ও মোহাম্মদের মৃত্যুর করুণ কাহিনী।

এদিকে কামারখালী ঘাটে ভাসমান ব্রীজ তৈরির কাজ চলছে। মাগুরা-ঢাকা যোগাযোগ ব্যবস্থার দ্রুত উন্নতি হওয়া প্রয়োজন। যুদ্ধক্ষেত্রের মাগুরা-কামারখালী অংশটা এতক্ষণে মুক্ত হয়েছে। পাকসেনারা এর পশ্চিম উত্তর কোনে ব্যুহ রচনা করে মজবুত হয়েছে। ক্যাপ্টেন এটিএম আব্দুল ওয়াহাব মিত্র বাহিনীর অফিসারদের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করে চলেছেন। ওয়াপদা ডাক বাংলা এখন আমাদের প্রধান কেন্দ্র হয়ে উঠেছে।

পাকসেনারা ফরিদপুরের ডুমাইন গ্রামে ও পার্শ্ববর্তী স্থানে আশ্রয় নিয়েছে। অভিনব সব বাংকার তৈরি করে নিজেদের আত্মরক্ষার চেষ্টা করেছে আর মিত্র বাহিনীর বিরুদ্ধে মর্টার ও অন্যান্য আধুনিক অস্ত্রের সাহায্যে লড়ে চলেছে। মর্টার শেল এসে আমাদের শ্রীপুর থানা ও মাগুরা থানা এলাকায় পড়তে লাগল। ওদিকে প্রতিদিন সকাল বিকাল মিত্র বাহিনীর গোয়েন্দা বিভাগ ও হেলিকপ্টার পাকসেনাদের প্রকৃত অবস্থান নিরীক্ষণ করে চলছে। সম্ভবত ইং ১২/১২/১৯৭১ তারিখে একটি হ্যালিকপ্টার এসে মাগুরা অবতরণ করে। এই হ্যালিকপ্টারে জেনারেল অরোড়া এসেছিলেন। আমি মাগুরা শহর থেকে দূরে কর্তব্যরত ছিলাম। আমি ফিরে এলে ক্যাপ্টেন আঃ ওয়াহাব সাহেব জানালেন জেনারেল অরোড়া আমাকে খুঁজছিলেন। আমার সাক্ষাৎ না হওয়ায় আমি দুঃখ প্রকাশ করলাম। আরো জেনে ছিলাম তিনি আমাকে তুলে নিতে এসেছিলেন।

মনে হচ্ছিল পাকসেনারা এখন যেন অনেকটা মরিয়া হয়ে উঠেছে। ডুমাইন গ্রামে এবং পার্শ্ববর্তী এলাকায় মুক্তিসেনা দলের পক্ষে নেতৃত্ব দিচ্ছিলেন হাবিলদার জালাল (বেঙ্গল রেজিমেন্ট), শেখ নূরুল ইসলাম (ডুমাইন) এরা পাকসেনাদের উপর উপর্যপরি আঘাত হেনে চলছিল। এ যুদ্ধে পাকসেনাদের হাতে যারা শহীদ হয়েছিলেন তারা হচ্ছেন শহীদ মফিজ শেখ, (ডুমাইন), শহীদ হাফিজার রহমান, ইপিআর (নিশ্চিন্তপুর) ও শহীদ খালিলুর রহমান (আর্মি) (নিশ্চিন্তপুর)। যুদ্ধটি সংঘটিত হয় তারাপুর। এতে আমরা যার পর নাই মর্মাহত হই। ¯^াধীনতার প্রাক্কালে এসে এমন একটা ঘটনা সত্যি বেদনাদায়ক। মুক্তিসেনাদের এই দলটি অত্যন্ত সাহসী ছিল। আমরা বালিয়াকান্দি থানা দখল করার জন্যে বহুবার চেষ্টা করি কিন্তু পারি নাই। অথচ আমাদের আকাক্সখা এরা সফল করে তুলেছিল। তাই এদের নিয়ে আমরা গর্বিত। আরো গর্বিত এ কারণে যে, হাবিলদার জালালের প্রয়োজনীয় যাবতীয অস্ত্র সস্ত্র আমিই সরবরাহ করেছিলাম। এসব বীর সৈনিকরা সত্যিই কৃতিত্বের অধিকারঅ তাদের সততা, ন্যায় নিষ্ঠা ও বিরোচিত আত্মদান আমাদের গর্বিত করেছে। জাতি তাদেও কথা কখনও ভুলতে পারবেন না।

ইত্যবসরে ফরিদপুরের নাড়ুয়া থেকে আমাদের বাহিনীর সিরাজুল ইসলাম (ইপিআর সিগন্যাল) আব্দুল মালেক, আব্দুল হাই ও অন্যরা এসে জানাল যে, ফরিদপুরের রাজবাড়ীতে সশস্ত্র বিহারীরা সাধারণ বাঙ্গালীদের উপর অত্যাচার চালিয়ে যাচ্ছে এবং সুযোগ মত নির্বিচারে বাঙ্গালী নিধন করে চলেছে। তাদেরকে কেউ রুখতে পারছে না। এ খবর পেয়ে আমাদের মুক্তিসেনারা তাৎক্ষণিকভাবে প্রতিকারের জন্যে প্রস্তুত হয়ে গেল। আমি এ ঘটনাটি ক্যাপ্টেন এটিএম আব্দুল ওহাবকেও জানালাম। সেখানে কামরুজ্জামানও উপস্থিত ছিল। সবাই উত্তেজিত হয়ে উঠল। ক্যাপ্টেন সাহেব একটা মর্টার দিয়েও সাহায্য করলেন। সম্মিলিত একটা দল অতি তাড়াতাড়ি রাজবাড়ী রওয়ানা হয়ে গেল। এই দলের এবং ফরিদপুর এলাকার মুক্তিযোদ্ধাদের সম্মিলিত একটা দল অতি তাড়াতাড়ি রাজবাড়ী রওয়ানা গেল। এই দলের এবং ফরিদপুর এলাকার মুক্তিযোদ্ধাদের সম্মিলিত আক্রমণে বিহারীরা পরাভূত হয়ে পিছু হটতে শুরু করে। এ যুদ্ধে অবাঙ্গালীরা অত্যাধুনিক অস্ত্রশস্ত্র ব্যবহার করেও টিকতে পারেনি। ¯^মূলে ধ্বংস হতে থাকে। স্থানীয় লোকদের উপর অত্যাচার করায় তারা পূর্ব থেকেই এদের উপর অত্যন্ত ক্ষিপ্ত ছিল। এহেন সুযোগ পেয়ে তারা বদলা নিতে শুরু করে। কুষ্টিয়া ও অন্যান্য স্থান থেকে এসে বিহারীগণ এখানে একত্রিত হয়। কিন্তু তাদের শেষ রক্ষা হয়নি। শুনেছি অনেক বিহারী এখানে মৃত্যুবরণ করে। এদিকে আমাদের হাতে যে ৩ জন পাকসেনা ধরা পড়ে, পরে তাদেরকে পাটের গুদামে আটকিয়ে রাখা হয়। তাদের খাওয়া-দাওয়ার সুব্যবস্থা করা হয়। মিত্রবাহিনীর সেনারা এ সংবাদ পেয়ে গাড়ী নিয়ে তাদেরকে আনতে যায়। পাক সেনাদের দিকে যখন তারা এগিয়ে যাচ্ছিল পাকসেনারা কিন্তু ওদের দেখে একটুও বিচলিত হয়নি। বরং তাদের প্রতি বিশেষ বিশেষ বাক্যবাণ বর্ষণ করতে থাকে। মিত্রবাহিনীর সেনারা তাদের চোখ বেঁধে গাড়ীতে উঠিয়ে নেয়।

মাগুরা থানায় পাকসেনাদের হুকুমে সাধারণ মানুষের দুইশত বন্দুক পুলিশের হেফাজতে রক্ষিত ছিল। আমার ভাতিজা ধনু মিয়া সেগুলি পরে সংগ্রহ করে আমাদের বাড়ীতে নিয়ে আসে। এসব বন্দুকের প্রতি মিত্র বাহিনীর লোকদের প্রচুর লোভ ছিল। তারা আমাদের নিকট থেকে এগুলি পাওয়ার চেষ্টা করে। কিন্তু আমি কখনই তা হাত ছাড়া করিনি। বিভিন্ন অজুহাত দেখিয়ে আমি তাদেরকে নিবৃত করি। পরে দেশ স্বাধীন হলে লাইসেন্স পরীক্ষা করে প্রকৃত মালিকের নিকট বন্ধুক ফিরিয়ে দেই। (সূত্র: আকবর হোসেন, মুক্তিযুদ্ধে আমি ও আমার বাহিনী, পৃষ্ঠা ১৪০-১৪৬)।

এদিকে যুদ্ধ শেষ হওয়ার পর পশ্চিমবঙ্গের হাসনাবাদ, টাকি (২ শিবির), বসিরহাট (৫ শিবির), স্বরূপনগর (৭ শিবির), বাদুরিয়া (৫ শিবির), গোবরডাঙ্গা, মসিআনন্দপুর (মসলন্দপুর), কালুপুর (৪ শিবির), মেদিয়া, ইছাপুর, সুটিয়া, বাণীপুর, পায়রাগাছি, লক্ষীপুর, সাধনপুর, সাহারা, ব্যারাকপুর, দিগবেরিয়া, দত্তপুকুর, কানাপুকুর, বারাসত (৩ শিবির), মামাভাগিনা (২ শিবির) মারিঘাটা, বাঘাহা, হেলেঞ্চা, গ্যাঁড়াপোতা, সল্ট লেক, দোগাছিয়া, করিমপুর, পলাশিপাড়া, বেতাই, নাজিরপুর, বানপুর, ছাপরা, ডোমপুকুরিয়া, পূর্ণগঞ্জ, জাভা, ভালুকা, ভাদুরপুর, মুড়াগাছা, দক্ষিমপাড়া (দক্ষিণপাড়া), কল্যাণী (৭ শিবির), শিকারপুর, মাজদিয়া, ভজনঘাট, বাদকুল্লা, উয়াশি, রানাঘাট ( ২ শিবির), শান্তিপুর এসব শরণার্থী শিবিরে আশ্রয় নেওয়া যশোর, ঝিনেদা, মাগুরার মানুষেরা নিজ এলাকায় ফিরতে উদগ্রীব হয়ে উঠেন। পরে তারা বিভিন্ন সীমান্ত দিয়ে বাংলাদেশের পথে রওয়ানা হন।
জাহিদ রহমান: সাংবাদিক-গবেষক

শেয়ার করুন...




©All rights reserved Magura Protidin. 2018-2022
IT & Technical Support : BS Technology